Our social:

Latest Post

Showing posts with label ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label ইসলাম. Show all posts

Saturday, 16 July 2011

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া

লেখক : শাহ আব্দুল হান্নান

দার্শনিকভাবে দেখলে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া, স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া৷ যিনি আমাকে বানিয়েছেন তাঁকে ভুলে যাওয়া৷ আল্লাহ নিজেই বলেছেন: "ইয়া আইয়্যুহাল ইনসানু মা গার্রাকা বি রাব্বিকাল কারিম" অর্থাৎ, হে মানুষ কিসে তোমাকে তোমার মহিমান্বিত রব সম্পর্কে উদাসীন করল? (৮২:৬ ) 

সত্যিকার অর্থেই বেশীর ভাগ মানুষ বাস্তবে স্রষ্টাকে ভুলে গিয়েছে৷ ইউরোপ-আমেরিকায় নাস্তিকের সংখ্যা অনেক৷ রাশিয়া পূর্বে অফিসিয়ালি নাস্তিক ছিল৷ এখনও সেখানে নাস্তিকতার হার কম নয়, বরং অনেক হবে৷অন্যদিকে যারা বিশ্বাসী বলে দাবী করে তাদের মধ্যেও অনেকে সন্দেহবাদী (skeptic)৷ অর্থাৎ বলবে না যে স্রষ্টা নেই, কিন্তু বাস্তবে স্রষ্টাকে স্মরণ করবে না বা তার আদেশ মেনে চলবে না৷ স্রষ্টাকে মেনে চলবে এরকম লোকের সংখ্যা খুব কম৷ 

খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা স্রষ্টাকে বিশ্বাস করে , তাদের মধ্যে স্রষ্টার কার্যকর আনুগত্য কম৷ সে তুলনায় মুসলমানদের অবস্থা ভালো৷ এখানে নাস্তিক নেই বললেই চলে এবং যারা বিশ্বাসী তারা কোন না কোন পর্যায়ে আমল করে৷ যারা নিজেদেরকে সেক্যুলার বলে দাবী করে , তাদেরও বেশীরভাগ একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত আমল করে৷ তারাও নামাজ পড়ে, ইফতার করে, সাহরী খায়, হালাল-হারাম দেখে চলে৷ তারাও কুরবানী, হজ্জ, ওমরা ও ঈদ পালন করে৷ সুতরাং মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের অনুশীলন তুলনামূলকভাবে ভাল৷

স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়ার ফলে দু'টি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। একটি হলো বস্তুবাদ ও নাস্তিকতা। আরেকটি হলো গোড়া সেক্যুলারিজম - সেটিও স্রষ্টাকে প্রায় অস্বীকার করার কাছাকাছি একটি অবস্থা। বিশ্ব সংকটের মূলে কাজ করছে এ দু'টি - একদিকে বস্তুবাদ ও নাস্তিকতা এবং অন্যদিকে সেক্যুলারিজম।
স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়ার প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থার উপরও পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সেক্যুলারিজমের উপর দাড়িয়ে আছে। বর্তমান বিজ্ঞান শিক্ষাতে রয়েছে সেক্যুলারিজমের গভীর ছাপ। ইউরোপের পন্ডিতরা এমনকি বর্তমানে মুসলমান বিজ্ঞানীরাও তাদের বইগুলো 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' দিয়ে শুরু করেন না। কিন্তু মুসলমানরা যখন বিজ্ঞানে উন্নতি করল (চীন ও ভারত থেকে গ্রহন করে), তখন তারা অনেক দিকে বিজ্ঞানের বিস্তার ঘটাল। সেসময় ঐসব মুসলমানরা তাদের বিজ্ঞানের প্রত্যেক বইগুলো 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' দিয়ে শুরু করতেন। তারা স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন গভীরভাবে। কিন্তু ইউরোপীয় বিজ্ঞানিরা বিশ্বাসী না হওয়ায় (অথবা সেক্যুলার হওয়ায় কিংবা স্রষ্টায় বিশ্বাস করা তাদের কাছে একটি লজ্জার বিষয় হওয়ায়), তারা স্রষ্টার কথা উল্লেখ করেননা। আমাদের মুসলিম বিজ্ঞানীরা এটি এখন লিখতে পারেন। কিন্তু তারাও লিখছেননা। এখন না লেখা রেওয়াজ হয়ে গেছে। অথচ আগে লেখাটাই রীতি ছিল। এখন বিজ্ঞানের বইগুলোতে আল্লাহ বা গড শব্দের উল্লেখ নেই। স্রষ্টা (creator) শব্দটি লেখা হয় না। এটি একটি অদ্ভুত ব্যাপার। কোথাও কোথাও প্রকৃতি (Nature) শব্দের উল্লেখ আছে। কিন্তু এই প্রকৃতি কি সেটি একেবারেই স্পষ্ট নয়। তারা একবারও ভাবেনা যে, এসব প্রাকৃতিক আইন আছে কিভাবে, আইন প্রণেতা ছাড়া কি কোন আইন হয়? তারা নাকি খুব যুক্তিবাদী, কিন্তু আমি তো কোন যুক্তি দেখছি না।
আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক ভালো দিক আছে, অনেক অবদান আছে আমরা মানি। কিন্তু এর পেছনে কাজ করছে এমন একটি মন যেটি স্রষ্টার প্রশ্নে, আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়বাদীতায় ভুগছে। স্রষ্টাকে স্পষ্ট স্বীকৃতি দিচ্ছে না। আল্লাহর নাম উল্লেখ করছে না। এটি উল্লেখ করা সভ্যতা বিরোধী মনে করছে। এটি একটি পশ্চাৎপদ ব্যাপার মনে করছে। এই যে ধারণা এটা আমাদের কালচারকে খারাপ করে ফেলছে। আমাদের কালচারে সংশয়বাদ ও নাস্তিকতার প্রভাব পড়ছে।
সমাজবিজ্ঞানেরও একই রকম অবস্থা। সমাজতত্ত্ব ধরেই নেবে যে ধর্ম একটি মানব সৃষ্ট বিষয়। অথচ তারা এভাবে দেখাতে পারত যে, স্রষ্টাই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের একটি সামাজিক প্রবণতা বা সামাজিক মন দিয়েছেন। স্রষ্টার সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আমাদের মধ্যে সমাজবদ্ধ হবার মানসিকতা রয়েছে। এজন্য আমরা একতাবদ্ধ হই এবং সমাজ গঠন করি। শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যান্য সেক্টরেরও একই অবস্থা। যেমন নৃবিজ্ঞানও স্বীকার করছেনা যে , মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টি করেছেন। এটিকে তারা একেবারেই বাদ দিয়ে দিচ্ছে। নৃবিজ্ঞান মানব সৃষ্টির ইতিহাস বের করার চেষ্টা করছে মাটি খুড়ে বের করা হাড় এবং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক চিহ্ন থেকে। এসব থেকে তারা যে ইতিহাস লিখছে তাতে তারা বলছে, মানুষ এমনি এমনিই হয়েছে; কোন স্রষ্টা নেই। এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, দারিদ্র বিশ্বের একটি বড় সংকট, দারিদ্রের জন্য মানুষের একটি বিরাট অংশ ভাল হতে পারেনা। এ সংকটের মূলেও রয়েছে ঐ আল্লাহকে না মানা, বস্তুবাদ এবং সেক্যুলারিজম।
মানুষ বস্তুবাদী হয়ে গেছে। গরীবের জন্য, দারিদ্র দূর করার জন্য কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সে উপলব্ধি করছেনা। অনেকেই দারিদ্র দূর করার জন্য ওয়াদা করে থাকে। আসলে তারা ওয়াদা করার জন্য ওয়াদা করে, কথা বলার জন্য বলে। সত্যিই কি কার্যকরভাবে তারা এগুলো চায়? বিশেষ করে দেশের পুঁজিবাদীরা এগুলো চায়না বলেই মনে হয়। কারণ পুঁজিবাদের তত্ত্বে গরীবের কথা নেই। প্রফিটের কথা আছে, মুক্ত বাজারের কথা আছে। সেখানে সরকারী হস্তক্ষেপ না করার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে বাজারের বিকৃতি (Market distortion) দূর করার কথা পুঁজিবাদী তত্ত্বের কোথাও নেই। গরীবের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে এটা পুঁজিবাদের কোথাও বলা নেই। যদিও এটা এখন পুঁজিবাদী দেশে করা হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা তারা পুঁজিবাদের কাঠামো থেকে বের হয়ে এসেই নিচ্ছে ।
কলোনিয়ালিজম এবং ইম্পেরিয়ালিজমও এসেছে বস্তুবাদ থেকেই। নিজের ভোগ ও জাতির ভোগের প্রেরণা থেকেই এসবের উৎপত্তি। এসবকিছুর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে শোষণ (exploit) করা। এই যে বস্তুবাদী স্বার্থপরতা এবং পুঁজিবাদ - এসব পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। এসবকিছু মিলে মানুষকে দায়িত্বহীন বানিয়েছে , তাকে ভোগবাদী করে তুলেছে। দায়িত্বশীল কাদের বলা যেতে পারে? যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং দুনিয়াকে এক্সপ্লয়েট করেনা। সুতরাং সকল সমস্যার মূল কারণ যদি বলতে হয়, আমি বলব স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া। এজন্য যুগে যুগে নবী-রাসূলরা আহবান করেছেন আল্লাহকে মানো এবং বল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' - আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে মানুষের মধ্যে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। মুসলিমদের এমনকি অমুসলিমদের জন্যও বলবো, যে কোন ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নাস্তিকতা থেকে ভাল। কারণ প্রত্যেক ধর্মের একটা এথিক্স বা নীতিবোধ আছে। নাস্তিকতার কোন নীতিবোধ নেই। সে তো নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করে। সে বিশ্বাস করে তার কোন বিচার হবে না, তার কোন জবাবদিহিতা নেই; সুতরাং দুনিয়ায় যা ইচ্ছা সে করতে পারে। এ ধরণের লোক সমাজের জন্য ভয়ংকর। এজন্য সবার মধ্যে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। আল্লাহকে চেনাতে হবে যতদূব সম্ভব। সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই সমাজ তথা বিশ্ব থেকে স্বার্থপরতা দূর হতে পারে, মূল রোগ তথা মূল সমস্যা দূর হতে পারে।

Sunday, 10 April 2011

এপ্রিল ফুল - একটি অসাধু ঐতিহ্য


১লা এপ্রিল- এমন একটি দিন যেদিন অনেক মানুষই বিনোদনের নামে মিথ্যা বলে, হাসি-ঠাট্টা করে আর অপরের সঙ্গে ব্যঙ্গ-তামাশা করে। জানা যায় যে, মিথ্যা বলার এ কুৎসিত অনুকরণটি, যাকে অনেকেই শুধুমাত্র সামান্য রসিকতা বলে বিবেচনা করেন, একদা প্রচুর মানুষের জীবনের বিশাল ক্ষতি সাধন করেছিলো। তবুও এই অসাধু ঐতিহ্য শুধুমাত্র যে কিছুসংখ্যক লোকজন দ্বারা পালিত হয় তা নয়, বরং আজকাল ১লা এপ্রিলে কিছু পত্রিকা ও ম্যাগাজিন মিথ্যা সংবাদ ও অসত্য গল্প প্রকাশ করার মাধ্যমে এতে অংশ নিয়ে থাকে।


অনেকেই এর উদ্ভব সম্পর্কে অনেক তথ্য বলেন, আমরা সেসবে যাচ্ছিনা, আমাদের মুসলিমদের জন্যে যে বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই ঐতিহ্যটি ইসলামিক শিক্ষা ও নৈতিকতার সরাসরি বিরুদ্ধাচারণ।

কেননা মিথ্যাচার কপটতার (মুনাফেকী) একটি খাস বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহর রসূল (স.) যে কোন কারণেই হোক মিথ্যা বলাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি (স.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন হয় ভালো কথা বলে নচেৎ চুপ থাকে।" {সহীহ বুখারী}

অধিকন্তু, তিনি (স.) বিশেষ করে তাদের লানত করেছেন যারা নিছক লোক হাসাবার জন্যে মিথ্যাচার করে। তিনি (স.) বলেছেন, "দুর্ভাগ্য তাদের ওপর যারা অপরকে হাসাবার জন্যে মিথ্যা কথা বলে, দূর্ভাগ্য তাদের ওপর।" {আবূ দাঊদ}

উপরের হাদীসটি আমাদের এপ্রিল ফুল নামক মিথ্যা প্রথায় অংশগ্রহণের গভীর পরিণতি সম্পর্কে জানিয়ে দিচ্ছে, যাকে পশ্চিমা সংস্কৃতি একাধারে মূল্যায়ণ ও উৎসাহিত করে এই দাবীতে যে, এটা আনন্দ ও মজা এনে দেয়। কিন্তু মুসলিম মাত্রই মনে রাখতে হবে যে, মিথ্যা বলা এবং প্রতারিত করাকে নবী (স.) নিষিদ্ধ করেছেন যদিও তা এ নিয়তে হয় যে তা মানুষকে মজা দেবে।

আব্‌দ আল-রহমান ইবনে আবি লায়েলা বলেন,
রসূল (স.)এর সাহাবীগণ আমাদের বলেছেন যে, তারা রসূল (স.)-এর সঙ্গে ভ্রমনে ছিলেন। তাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে পড়েন আর তাদের কয়েকজন গিয়ে ঐ (ঘুমন্ত ব্যক্তির) তীরগুলো নিয়ে নেন। যখন সে জেগে উঠল, সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেলো (তার তীরগুলো হারিয়ে যাবার কারণে) এবং মানুষেরা হাসতে লাগলো। নবী (স.) বললেন, "তোমরা কি নিয়ে হাসছো?" তারা বললেন, "তেমন কিছু না, আমরা কেবল তার তীরগুলো নিয়েছিলাম আর সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেছে।" রসূল (স.) বললেন, "একজন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমকে ভয় দেখানো নিষিদ্ধ" {আবূ দাঊদ (৫০০৪) ও মুসনাদ আহমদ} [শেখ আলবানি তার সহীহ আল-জামীতে (৭৬৫৮) একে সহীহ বলেছেন]

রসূল (স.) মিথ্যাবাদীর জন্য কঠোর শাস্তির বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, "আমি দেখলাম (স্বপ্নে) যে, দুজন মানুষ আমার কাছে এলো।" এরপর নবী (স.) তার স্বপ্নের বর্ণনা দিলেন। "তারা বললো, 'সে লোকটি, যার গাল চিড়ে ফেলা হচ্ছে দেখলেন (তার মুখ থেকে কান পর্যন্ত), সে একজন মিথ্যাবাদী ছিলো, সে মিথ্যা কথা বলতো আর মানুষ তার সূত্রে সে মিথ্যাকে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। সুতরাং সে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত এভাবেই শাস্তি পেতে থাকবে।'" {সহীহ আল-বুখারী, ভলিউম ৮, হা/১১৮}

আল্লাহ তায়ালা আমাদের এসব অসদাচরণকে প্রশ্রয় দেয়া থেকে রক্ষা করুন ও তাদের এসব অনুকরণ থেকে বেঁচে থাকবার তৌফিক দান করুন যারা আমাদের মুসলিম সমাজকে এর দ্বারা দূষিত করতে চায়।

হে আমার ভাই/বোনেরা, প্রবঞ্চনামূলক এ ঐতিহ্য এড়িয়ে চলুন, নিজেদের গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

আমীন!!

* ভাই আদিল ইবনে মঞ্জুর খান (ভারত থেকে)-এর পাঠানো ইমেইল থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী।
** এ লেখাটি যে কেউ কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই তাদের ব্যক্তিগত বা গ্রুপ সাইটে বা ইন্টারনেটের যে কোনো জায়গায় প্রচার করতে পারবেন এবং যে কোন অলাভজনক প্রকাশনায় প্রকাশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে লেখকের নাম/লিংক প্রকাশ করা কোনো শর্ত নয়। মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন আমরা কে কি করছি।



লিখেছেনঃ মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী



Saturday, 9 April 2011

আমেরিকান ধর্ম যাজক ইউসুফ এসতেসের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কাহিনী

বিসমিল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়া সালাম রাসূলিল্লাহ ওয়া আলা আ'লিহি ওয়া সাহাবী আজমানইন আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইললাল্লাহু ওয়াদাহু লা'শারীকালা ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। আসসালামু আলাইকুম। আমার নাম ইউসুফ। আপনারাও ইউসুফ বলেন তারাও ইউসুফ বলে। আমি আমার স্ত্রীকে ইউসুফ নামটা শেখাতে চেষ্ট্রা করতাম কিন্তু সে প্রায়ই ভুল উচ্চারণ করতো, সে বলতো , 'ইউসলেস'। হা, হা, হা। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে থাকেন মুসলিম, খ্রিস্টান উভয়েই যে আমি কিভাবে মুসলিম হলাম।
খ্রিস্টানরা যখন শুনে তখন তারা অবাক হয়, তারা বলে, তুমি একজন প্রিচার ছিলে! তুমি জিসাসকে চিনতে পারনি? কামান ম্যান। খ্রিস্টান ধর্মে যারা ধর্মীয় বাণী প্রচার করে তাদের প্রিচার বলা হয়, কোন কোন সময় প্রিস্টও বলা হয়ে থাকে তবে প্রিস্ট বলতে সাধারণত বুঝায় যারা ক্যাথলিক চার্চে থাকে, ক্যাথলিক ছাড়া কেউ প্রিস্ট হতে পারে না, প্রটোস্ট্যান্ডদের বলা হয় পাস্তুর, মিনিস্টার, রেভারেন্ড, প্রিচার। আমি একজন প্রিচার এবং মিউজিকের মিনিস্টার ছিলাম। আমি এবং আমার বাবা উভয়েই মিনিস্টার ছিলাম এবং আমরা দু'জনেই ব্যবসা করতাম। আমাদের কাছে ব্যবসাটাই বড় ছিল, মানে ব্যবসাটিকেই আমরা বেশী প্রাধান্য দিতাম। ব্যবসা করার পর সময় পেলে আমরা প্রিচারের কাজ করতাম। আমাদের ব্যবসা বিস্তৃত ছিল টেক্সাসে, ওয়াইহিসহ আরো অনেক এড়িয়াতে। আমাদের ব্যবসার ধরণটা ছিল আমরা মানুষের নিকট থেকে জিনিস নিয়ে বিক্রি করতাম যেমন হ্যান্ডিক্রাফ্ট, বিশেষত মহিলারা এগুলো বানিয়ে আমাদের নিকট দিত আর আমরা এগুলো বিক্রি করতাম আর তাতে আমাদের সেই সাথে তাদেরও ভালই লাভ হতো। একদিন আমাকে বাবা বললো আমরা ইজিপ্টে ব্যবসা করবো। আমি বললাম, এটাতো খুব ভালো হয়, আমরা ইন্টারন্যাশনাল ব্যবসা করব। বাবা আরো বললেন, আমরা ইজিপ্টের যে লোকের সাথে ব্যবসা করবো সে কায়রোর অধিবাসী; তাদের পিড়ামিড আছে, নীল নদ আছে; আমি বললাম সেটা তো খুবি ভাল। সবশেষে আমরা বাবা বললেন, সে একজন মুসলিম! আমি এ মুহুর্তটা কখনই ভুলতে পারি না, আমি ডাইনিং আর কিচেনের মাঝে দাড়িয়ে বাবার সাথে কথা বলছিলাম, কিন্তু যখন শুনলাম সে একজন মুসলিম! আমি বললাম, সে একজন মুসলিম! নো ওয়ে, আমি তার সাথে ব্যবসা করবো না। হেই ড্যাড কামান, তোমার এই ব্যাপাড়ে অন্যদের চেয়ে বেশী জানা উচিত। আমরা প্রিচার আর সে হচ্ছে গডের একজন শত্রু! আমাদেরকে এভাবেই শেখানো হতো, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তারা মুসলিমদের সম্পর্কে খারাপ কথাগুলো প্রকাশ করতো, মুসলিমরা কখনই ভাল না। এখনতো মুসলিমদের ঢালাওভাবে টেরোরিস্ট বলা হয় কিন্তু তখন মুসলিম মানেই ছিল হাইজ্যাকার, কিডন্যাপার। তারা আমাদের শিখাতো মুসলিমরা কোন গডে বিশ্বাস করে না! তারা মরুভুমিতে অবস্থিত একটা কালো বাক্সের পূজো করে আরা তারা দিনে পাঁচবার মাটিতে চুমো দেয়। মুসলিমদের ব্যাপাড়ে আমরা এটুকুই জানতাম! আমাদের এভাবেই শিখানো হতো। আর এই মুসলিম আমাদের সাথে ব্যবসা করবে! আমি বাবাকে বললাম না আমি করবো না কিন্তু তিনি আমাকে বললেন তুমি তার সাথে দেখাতো কর, সে খুবই একজন চমৎকার মানুষ। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না কারণ আমি কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলাম না। বাবা বললেন, আমি চাই তুমি তার সাথে দেখা শুধু দেখা কর। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি দেখা করব। আমি এটি শুধু তোমার জন্য করব। এরপর আমি চিন্তা করলাম আমি যেদিন তার সাথে দেখা করব সেদিন আমি প্রথমে চার্চে যাব তারপর আমার ডান হাতে থাকবে বাইবেল, বুকের উপর ঝুলানো থাকবে বেশ বড় একটা ক্রুশ, মাথায় থাকবে একটা ক্যাপ, যাতে লেখা থাকবে, 'জিসাস ইজ দা লর্ড', আমার সাথে থাকবে আমার খ্রিস্টান স্ত্রী, আমরা মুসলিমটাকে দেখিয়ে ছাড়ব জিসাস কে?

সেইদিনটি আসল, আমি চার্চে গেলাম; চার্চে সেদিন ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে দাউদ (আ) এর স্যালভেশনের কাহিনী বলা হয়েছিল, আমার মাথায় একটা কথা ঢুকে গেল, দাউদ (আ) এর স্যালভেশন! কিন্তু স্যালভেশনতো শুধু জিসাসের জন্য। (খ্রিস্টান ধর্মে কারো স্যালভেশন বলতে বুঝায়, যে সে শয়তানের স্প্রিট থেকে মুক্ত কারণ জিসাস এরজন্য ক্রসের উপর মারা গিয়েছিলেন।) যাই হোক, তারপর আমি বাবার অফিসে গেলাম, আমি আশা করেছিলাম যে সাদা লম্বা কাপড় পড়া, বিশাল লম্বা দাড়িওয়ালা, কালো কোট পরিহিত, তলোয়ার খাপ সহকারে কাউকে দেখবো। কিন্তু আমি সেখানে সেরকম কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি বাবাকে বললাম, কোথায় সে ব্যাক্তি ? বাবা বললেন, তোমার পাশেই তো! আমি দেখলাম, খুবই সাধারন একজন মানুষ আমাদের মতই। আমি হাত মিলিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, হাও ডু ইউ ডু? তুমি কেমন আছ? তারপর সেও আমার সাথে হাত মিলাল আর বললো যে তার নাম, মুহাম্মাদ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি গডে বিশ্বাস কর? সে বললো, হ্যা অবশ্যই করি! আচ্ছা, গডের নবী মুসা, ইব্রাহিম? সে বললো, জ্বী আমি করি! আমি মনে করলাম সে হয়তো কথার কথা হিসেবে আমার সাথে স্বীকার করে যাচ্ছে তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস কররাম, জিসাসের ব্যাপাড়ে? সে বললো, আমি করি! এরপর আমি চিন্তা করলাম এর সাথে তো ব্যবসা করা যায়, কোন সমস্যা নেই। আমি তার সাথে চা পান করতে করতে অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করলাম আর যেহেতু আমি প্রিচার ছিলাম তাই তাকে বাইবেল থেকে অনেক কিছু বলতে লাগলাম। আমি জেনেসিস অধ্যায়টি খুললাম, আর তাকে বললাম, চল ইব্রাহিম নিয়ে আলোচনা করি.... ইব্রাহিমের দুইটি ছেলে ছিল.....। শুনে সে শুধু বললো, হুমমম...। সে কায়রোর আল আজহার ইউনিভার্সিটির একজন গ্রাজুয়েট ছিল।

এরপর তার সাথে আমার আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল রমাদান মাসে। সে তার বন্ধুদের সাথে থাকতো কিন্তু তার বন্ধুরা হঠাৎ তাদের থাকার জায়গা পরিবর্তন করলো আর তাই সে সিদ্ধান্ত নিল যেহেতু রমাদান মাস তাই সে মসজিদে ইতিকাফে বসবে। আমি তখন ইতিকাফের ব্যাপাড়টি নিয়ে কিছুই জানতাম না। আমি মনে করেছিলাম তার কোথাও থাকার জায়গা নেই তাই সে মসজিদে যাচ্ছে। আমি আমার বাবাকে ব্যাপড়টি বললাম, আর বললাম সে আমাদের সাথে এসে থাকুক। কিন্তু বাবা বললেন, তার তো টাকা আছে! আমি বললাম নেই, না হলে সে মসজিদে থাকবে কেন? আমরা খ্রিস্টানরা কি কখনো চার্চে থাকি? ওহ... কি বিপদেই না সে পড়েছে! বাবা বললেন, না তোমার কিছু করার দরকার নেই। আমি বললাম, তাকে বলে তো দেখি! তাই আমি তাকে আমাদের বাসায় এসে থাকার জন্য অফার করলাম কিন্তু সে তাতে রাজি হল না সে বললো মসজিদে তাকে থাকতে হবে এবং সেখানে তাকে কিছু ভাল কাজ করতে হবে। আমি মনে করলাম ব্যাপাড়টি বোধহয় তার আত্মসম্মানে বাধা দিচ্ছে তাই আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে তুমি আমাদের বাসায় পে করে থাক! সে বললো কত? আমি বললাম, সপ্তাহে ১৫ ডলার! আমেরিকাতে ১৫ডলার মানে কিছুই না। সে একটু ইতস্তত করতে লাগলো! আমি তাকে বললাম, ১৫ ডলার শুধু থাকার জন্য খাবারের ব্যাপারটি আলাদা। সে তখন রাজি হল। এরপর আমি বাবাকে বললাম, দেখলে তো আমি কিভাবে তাকে রাজি করালাম। সে এখন পুরো ব্যাপাড়টি টাকা পে করার মাধ্যমে বিবেচনা করছে। পরে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছিলাম যে সে আসলেই আমাদের সাথে থাকতে চেয়েছিল আমারিকানদের জীবন-যাপন বিশেষভাবে সে জানতে চেয়েছিল প্রিচাররা কিভাবে দাওয়া দেয় এবং তাদের লাইফ স্টাইল।

এরপর সে আমাদের বাসায় এসে থাকতে লাগল। আমি তার সাথে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম আর সে ধীরে ধীরে খ্রিস্টিয়ানিটি সম্পর্কে জেনেছিল। আমরা ব্যবসার জন্য একসাথে ভ্রমণ করতাম আর আমরা একটি লম্বা টেবিলের উপর জিনিসগুলো রেখে বিক্রি করতাম। মানুষজন এসে টেবিলের উপর জিনিসগুলো দেখতো আর যখন তারা কিনতে চাইতো টেবিলের উপর রাখা কোন জিনিস তখন সে তার ব্যাগ থেকে বের করে নতুন জিনিসটি তাদেরকে দিতো। প্রথমদিকে আমি শুধু লক্ষ্য করতাম কিছু বলতাম না। এরপর একসময় আমি তাকে বললাম, হেই মুহাম্মাদ, তুমি ব্যাগ থেকে বের করে নতুন জিনিস কেন বিক্রি করছ? টেবিলের উপর রাখা জিনিসগুলো পুরোনো সেগুলো আগে বিক্রি হওয়া দরকার। আগে পুরাতন গুলো শেষ হোক তারপর নতুনগুলো। কিন্তু সে বললো, আমার ধর্ম আমাকে এমনটি শেখায় না! আমার ধর্ম আমাকে বলে, ব্যবসার সময় জিনিস বিক্রয়ের ক্ষেত্রে তুমি মানুষকে সর্বোত্তম জিনিসটি দিবে! আমি শুনে একটু অবাক হলাম..কি বলবো ভেবে পেলাম না.... ওকে, হোয়াটএভার!

তার সাথে থাকতে থাকতে আমি অনেক কিছু শিখতে লাগলাম। আর বিশেষ করে যে বিষয়টি ভাল লাগতো তা হলো আল্লাহর নিকট বিনয় প্রকাশ! আসলে সে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিল। আমি তার সাথে অনেক বিষয়ে তর্ক করতাম কিন্তু সে ছিল অনেক বুদ্ধিমান আর জ্ঞানী ব্যক্তি, সে বিতর্কগুলোতে সবসময়ই আমাকে জিততে দিতো। আমি তার সাথে যে কোন বিতর্কে জিততাম। কিন্তু সে যদি আমাকে হারাতে চাইতে তাহলে সে সহজেই হারাতে পারতো! সে এভাবেই দক্ষতার সাথে আমার সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছিল।

আমি আরো একজন প্রিচার কে চিনতাম, যে তার বাম কাধে বেশ বড় আকারের একটা ক্রুশ নিয়ে ফুটপাথ দিয়ে ঘুরে বেড়াতো আর লোকজন তাকে থামিয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতো। সে একদিন হার্ট এট্যাক করলো তাই তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তাই আমি তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম আর যখন আমি তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তখন আমার আরো একজন লোকের সাথে দেখা হল যে হুইল চেয়ারে বসা ছিল। এই ভদ্রলোকের একটা সমস্যা ছিল, সে কারো সাথে কথা বলতে চাইতো না। আমি তাকে বললাম, আমি তোমাকে জিসাসের কাহিনী শুনাই তোমার অনেক ভাল লাগবে। আমি আমার বাইবেলটি বের করলাম। আমি তাকে নবী ইউনুস (আ) এর কাহিনী বলতে লাগলাম। আমি আরো বললাম দেখ, তাকে মাছের পেটে কতদিন থাকতে হয়েছিল! তার তোমার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা হয়েছিল এবং গড তাকে বাঁচিয়েছিলেন সুতরাং গড তোমাকেও বাঁচাবে। সে শুধু বললো, হুমমমম.... সে আমার সাথে কথা বলতে চাইছিল না। আমি তাকে বললাম, তোমার নাম কি? সে আমাকে তার নাম বললো না! আমি তাকে বললাম, তুমি কোথা থেকে এসেছ? সে বললো আমি বিনাস থেকে এসেছি! আমি একটু অবাক হলাম, বিনাসটা আবার কোথায়? যদিও টেক্সাসে বিনাস বলে একটা এড়িয়া ছিল। সে আমাকে বললো, অন্য গ্রহ থেকে!

এরপর আমি প্রায়ই তার সাথে দেখা করতে যেতাম আর বাইবেল থেকে কাহিনী বলে শুনাতাম। একদিন আমি তাকে হুইল চেয়ার ঠেলে ঘুরাচ্ছিলাম হঠাৎ সে কাঁদতে শুরু করলো। সে বললো, আমি তোমার কাছে আমার অপরাধের(কনফেস) কথা বলবো আর তুমি আমার ক্ষমা করার ব্যবস্থা করে দিবে। ক্যাথলিক চার্চে প্রিস্টের নিকট অপরাধের(কনফেস) কথা বলা হয় আর প্রিস্ট তাকে তার ক্ষমা করার ব্যবস্থা করে দেন! আমি ক্যাথলিক ছিলাম না, আমি তাকে বললাম, দেখ আমি প্রিস্ট নই, আমি একজন প্রিচার। সে বললো আমি জানি, তুমি এটা ভাল করতে পারবে, আর আমি একজন প্রিস্ট! আমি বললাম, ওহ মাই গড! মনে মনে বললাম, এই ভদ্রলোক একজন প্রিস্ট! তার বাইবেলের জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশী। সে বললো, আমার একটি কঠিন সময় অতিবাহিত হচ্ছে, আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আমি অনেক সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলাম, আমি হাসপাতালে ছিলাম, আমি ক্ষমা প্রার্থী বলে সে কাঁদতে লাগলো। যখন সে কাঁদতে শুরু করলো আমি খুব ব্যাথিত হলাম আমি বলাম ঠিক আছে।

আমার বন্ধু হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আমি প্রায়ই যেতাম আর সে হাসপাতার থেকে চলে যাওয়ার পরও আমি যেতাম ঐ লোকটির সাথে দেখা করার জন্য। একদিন আমি হাসপাতালে গেলাম, যেয়ে জানতে পারলাম লোকটি চলে গেছে! আমি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কোথায় গেছে? নার্স বললো, সে বাড়িতে চলে গেছে। বাড়িতে চলে গেছে! সে সাউথ আমেরিকার একজন মিশনারী প্রিস্ট(ফাদার), সে কিভাবে বাড়িতে যেতে পারে? সে বললো, সে তার পরিবারের নিকট চলে গেছে। আমি বললাম, আমি তাকে চিনি, আর তার কোন পরিবার নেই, সে কোথায় যাবে? নার্স বললো, আমি জানি না আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়। আমি বললাম, ঠিকআছে আমাকে তার ডকুমেন্টগুলো দেখতে দাও। নার্স বললো, আমি তা করতে পারবো না, ফাইলগুলো তালাবদ্ধ আর ঐগুলো বাইরের কেউ দেখতে পারে না। আমি নার্সটির মুখোমুখি হলাম আর বললাম, দেখ এই লোকটি যে কোন সময় রাস্তায় মারা যেতে পারে আর তখন এর জন্য তুমি দায়ী হবে। সে বললো, ঠিক আছে, ফাইলগুলো ঐ জায়গায় আছে ধরা পড়লে আমি কিছু জানি না, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমি ফাইলে দেখলাম সে কোন ঠিকানার কথা লিখে গেছে, আমি দেখলাম সে এমন এক জায়গায় গেছে যেখানে মানুষ সাধারণত যায় যাদের কোন থাকার জায়গা থাকে না।

আমি সে জায়গায় গেলাম, আমি তার দেখা পেলাম, সে ক্র্যাচে ভার দিয়ে হাটছিল। সে আমাকে দেখে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো আমাকে এই জায়গা থেকে উদ্ধার কর। আমি তাকে বললাম ঠিকআছে তুমি আমার বাড়িতে আস। এখন আমার বাড়িতে দুইজন অতিথি হল, একজন হল ক্যাথলিক প্রিস্ট আর অন্যজন হল মুসলিম। আমি চিন্তা করেছিলাম, আমি প্রিস্টকে প্রোটোস্ট্যান্ট বানাবো আর সেই সাথে মুসলিমটিকেও খ্রিস্টান বানাবো! এই ব্যাপাড়ে আমার খুবই উচ্চ আশা ছিল কিন্তু আমি যা আশা করেছিলাম সে অনুযায়ী আসল ঘটনা ঘটে নি। কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল।

আমরা রাত্রে খাওয়ার টেবিলে আলাপ আলোচনা করতাম যেমন, বাইবেল কাকে বলে? স্যালভেশন কি? আমার বাবার কাছে যে বাইবেলটি ছিল সেটি ছিল কিং জেমস ভার্সন। আপনার হয়তো অনেকেই এই ভার্সনটির কথা শুনে থাকবেন। আর আমার কাছে ১৯৫৩ এর রিভাইসড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন এবং এর মধ্যে লেখা ছিল কিং জেমস ভার্সনে অনেকগুলো বড় বড় ভুল রয়েছে! প্রায়ই আমার বাবার সাথে বাইবেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হতো, বাবা বলতেন, এই ব্যাপাটি এই রকম আমি বলতাম না ব্যাপারটি আসলে এই রকম! আমার স্ত্রীর কাছে ছিল জিমি সোওয়াগঢ় ভার্সন, এটি ছিল আরো ভিন্ন রকমের! আর ক্যাথলিক প্রিস্টের কাছে ছিল অন্য একটি ভার্সন যাকে বলা হয় ওল্ডার ভার্সন, তারা ডিয়াল করতো ৭৩টি বই নিয়ে আর আমরা ডিয়াল করতাম ৬৬টি বই নিয়ে! আর তার ভার্সনের সাথে আমার ভার্সনের অনেক অমিল ছিল এবং অনেক বিষয় ছিল যেগুলোতে কোন মিলই ছিল না। আমারা প্রায়ই একই বিষয় নিয়ে প্রত্যেকে ভ্ন্নি ভিন্ন মত পোষণ করতাম, আমি বলতাম একরকম, বাবা বলতো একরকম, প্রিস্ট বলতো এক রকম, স্ত্রী বলতো এক রকম আর মুহাম্মদ এক পাশে চুপ করে বসে থাকতো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কুরআনের কতগুলো ভার্সন রয়েছে? সে বললো, কুরআনের কোন ভার্সন নেই, এর একটিই মাত্র অর্জিনাল ভার্সন যা আরবী ভাষায় রচিত হয়েছিল আর আরবী ভাষা এখনো বহাল তবিয়তে বর্তমান রয়েছে! এই বইতে রয়েছে পথ নির্দেশনা তাদের জন্য যারা তাকওয়া সম্পন্ন। আর ভাল লোকেরাই এর থেকে হেদায়াত পেতে পারে। কিন্তু যখন সে বললো, এর একটি মাত্র ভার্সন আছে, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! সে আরো বললো, এটি এর অর্জিনাল আরবী ভাষায় রয়েছে। আমি মনে করলাম সে মিথ্যা বলছে, সে অবশ্যই মিথ্যা বলছে এবং সে সম্ভবত এই কথা বলছে এই জন্য যে সে আমাদের দেখেছে আমরা কিভাবে একে অপরের সাথে বিরোধ করছি! আর আমি তখন আরবী ভাষা জানতাম না তাই আমি বুঝতে পারলাম না আমার আসলে কি বলা উচিত, হতে পারে অর্জিনাল, আই ডোন্ট নো! সে আমাদের আর কিছু বলে নি কিন্তু সে আমাদের মাথায় একটা চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তার কুরআনের ভার্সন মাত্র একটি আর আমাদের এতগুলো!

অন্য একসময় আমাদের একটা আলোচনা হয়েছিল ঐ প্রিচের সাথে যে ক্রস নিয়ে ঘুরে বেড়াত, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি ট্রিনিটি সম্পর্কে জানতে চাই। সে বললো, তুমিতো জান ট্রিনিটি কি? আমি জানি তবে আমি আরো ক্লিয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাই যাতে আমি অন্যদের কাছে ভালভাবে এটি বর্ণনা করতে পারি। তখন সে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে, ব্যাপারটি একটা আপেলের মত, আপেলের চারপাশে থাকে সেপ বা স্কীন আর এরপর থাকে নরম অংশ আর তারপর থাকে বীজ, তিনটি অংশ কিন্তু একটি আপেল। এই ব্যাখ্যা শোনার পর মুসলিম লোকটির নিকট যাচ্ছিলাম ট্রিনিটি ব্যাখ্যা করার জন্য কিন্তু যাওয়ার পথেই এই ব্যাখ্যাটি আমার নিজের কাছেই বেমানান মনে হলো কারণ আমি যখনই বীজের কথা বলবো তখন নিশ্চয় মুসলিম লোকটি বলবে আপেলের বীজ অনেকগুলো থাকে সুতরাং তিনটি জিনিস হল কোথায়? তাহলে কি তোমাদের গড অনেকগুলো? নো নো নো, এভাবে হবে না তাই আমি আবার প্রিচের নিকট ফিরে গেলাম এবং তাকে বললাম যদি কেউ বলে আপেলের অনেকগুলো বীজ থাকে তখনতো এই যুক্তি খাটবে না। তখন সে বললো আচ্ছা ঠিক আছে, ডিম দিয়ে তুমি ব্যাখ্যা করতে পারবে কারণ ডিমের চারপাশে থাকে খোলস, তারপর থাকে সাদা অংশ এবং এরপর থাকে হলুদ অংশ। তিনটি অংশ কিন্তু একই জিনিস। আমি মনে করলাম এইবার ঠিক আছে কিন্তু পথিমধ্যে আবার আমার মাথার মধ্যে অন্য একটি চিন্তা জেগে উঠলো, ডিমের মাঝে হলুদ অংশ অনেক সময় দুইটা থাকে তাহলে তো গড চারটি হয়ে গেল অথবা হলুদ অংশটি পচাঁ থাকতে পারে! নাহ আমি আর প্রিচকে জিজ্ঞেস করতে যাব না।

এরপর একদিন বাজারে একটা লোকের সাথে কথা বলার সময় আমি ভাবছিলাম মুহাম্মদ বলেছিল, ইসলামে গড একজন আর তিনি আল্লাহ। তখন আমি লোকটিকে বললাম, তুমি জান, ট্রিনিটি বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে! সে অবাক হল, বললো তুমি কি আমার সাথে মশকরা করছ? তুমি একজন প্রিচার আর তুমি বলছ তোমর ট্রিনিটি বিষয়ে সন্দেহ হয়? আমি বললাম, তুমি চিন্তা করে দেখ ট্রিনিটি বলতে আসলে কি বুঝায়? নাহ এটা আসলে লজিক বিহীন, কিভাবে তিনজন একজন হতে পারে? তখন লোকটি বললো, ঠিক আছে, আমি তোমাকে জিনিসটি ব্যাখ্যা করছি, আমি একজন, আমার স্ত্রী অন্যজন আর আমার ছেলে আরেকজন কিন্তু আমরা তিনজনে মিলে এক, একটা পরিবার। এটা হচ্ছে গডের ফ্যামিলি, তুমি ব্যাপারটিকে এইভাবে চিন্তা কর। কিন্তু এই বিষয়টি ট্রিনিটি ব্যাপারটিকে আরো অধিক সন্দেহযুক্ত করে তুললো। কারণ যদি ডিভোর্স হয়! ধর তোমার ডিভোর্স হল, তোমার স্ত্রী তোমার সব সম্পত্তির মালিক হয়ে গেল তখন তোমার আর কি থাকল? না না এভাবে হবে না, আমি ট্রিনিটি বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা চাই।

এরপর থেকে আমি পুরো বিষয়টি আরো ভালভাবে চিন্তা করলাম কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলোর কোনটিই আমার যুক্তির নিকাট টিকতে পারলো না, তাহলে আমি অন্যকে বুঝাবো কি করে? আমি মুহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি গডের ব্যাপাড়ে কি চিন্তা কর? সে বললো, আউযু বিল্লাহিমিনাশ শায়তনির রাজিম, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম, কুলহু আল্লাহু আহাদ; আল্লাহুস সামাদ; লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ; ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ। তখন সে ব্যাপরটিকে এইভাবে ব্যাখ্যা করল,
বলুন, তিনি আল্লাহ, এক,
আল্লাহ অমুখাপেক্ষী,
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি
এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।
আমিও আসলে বিষয়টি এইভাবে চিন্তা করেছিলাম কিন্তু আমি তো তা গ্রহণ করতে পারি না আর ব্যাখ্যাটি ছিল খুবই সহজ কিন্তু অনেক যুক্তিযুক্ত। মহান আল্লাহ কুরআনে আমাদেরকে বলতে বলেছেন, ডোন্ট সে থ্রি, ট্রিনিটির কথা বলো না। ওল্ড টেস্টামেন্ট মানে হচ্ছে তাওরাত, সং মানে হচ্ছে যবুর আর নিউ টেস্টামেন্ট মানে হচ্ছে ইন্জিল; এই তিনটির কোথাও ট্রিনিটি শব্দটি নেই, একটিবারও নেই! একটি বারও ট্রিনিটি শব্দটি নেই। কিন্তু এটি কুরআনে রয়েছে! এটি আমাদের বলছে, তাদের ট্রিনিটি বলতে না কর! আমাদের কোন বইয়ে ট্রিনিটি শব্দটি নেই কিন্তু আল্লাহ বলছেন, তোমরা ট্রিনিটি বলো না! তারপর, বাইবেল শব্দটি বাইবেলের কোথাও নেই! একটি বারের জন্য বাইবেল শব্দটি উল্লেখ নেই! বাইবেল শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ বিবলিয়োস থেকে যার মানে হচ্ছে, বুক বা বই। কিন্তু বই শব্দটি কুরআনে রয়েছে অনকেবার! এটি হচ্ছে, কিতাব! আহলে কিতাব, পিপল অব দি বুক অর্থাৎ আহলে কিতাবধারীরা। আমরা বাইবেলে যদিও কিছু পাই তাও খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে কিন্তু কুরআন এ সে বিষয়গুলো আছে একেবারে ব্যাখ্যাসহ! কুরআন দিয়েই আমি বাইবেল অনেক ভালভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি কারণ বাইবেলে যা আছে তা দিয়ে আমি বিষয়গুলো পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না! তখন এই ব্যাপারটি আমার মাথায় জেগে উঠলো, সে যা বলছে তাতো সত্য! কিন্তু আমিতো ব্যাপারটি গ্রহণ করতে পারি না।

যাইহোক আমি বিষয়গুলো একত্রিত করলাম এবং আমার প্রিচিং এর বক্তৃতায় আমি বলতে লাগলাম আমি কুরআন থেকে যা শিখেছি তা বাইবেলের চেয়েও খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করা আছে! অনেকেই আমার কথা পছন্দ করল আর অনেকেই পছন্দ করলো না। আর যখন আমি স্যালভেশন নিয়ে কথা বলছিলাম তখন আমি বলেছিলাম, আমাদের কোন রক্ষাকারী নেই একমাত্র গড ছাড়া আর এটি বাইবেলে উল্লেখ করা আছে। এটি একদম পরিস্কারভাবে উল্লেখ করা আছে, জিসাস তোমার রক্ষাকারী নন কিন্তু গড তোমার রক্ষাকারী! যখন আমি এই বিষয়টি পেলাম তখন আমি বললাম আমাকে বিষয়টি একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে দাও। কিন্তু আমি যা করছিলাম তা সত্য গোপন করার মত আমি সত্যকে পরিবর্তন করে দিচ্ছিলাম। এই বিষয়ে আমাকে অবশ্যই কিছু করতে হবে। আমি বিশ্বাস করলাম গড মাত্র একজনই, আমি তাদের বললাম, ট্রিনিটির কথা ভুলে যাও। আমার বাবা কখনই ট্রিনিটি বিশ্বাস করতেন না! সুতরাং এই ব্যাপাড়ে তার কোন সমস্যা ছিল না।

এরপর আর একটি নতুন ঘটনা ঘটল। প্রিস্টটি মুসলিমটিকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি তোমার সাথে তোমাদের চার্চে মানে মসজিদে যেতে পারি? সে বললো, অবশ্যই কোন সমস্যা নেই, তুমি আসতে পার। সে গিয়েছিল এবং যখন ফিরে এসেছিল তখন আমি তাকে একদিকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তারা সেখানে(মসজিদে) কি করে? আমাদের বল, তারা সেখানে কি করে? তারা কি কোন প্রাণী হত্যা করে সেই জায়গায়? কি করে তারা সেখানে? তখন সে বললো না, তারা বুকে হাত বেধে দাড়ায়, প্রার্থনা (নামায) করে আর এরপর তার মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়! আমি তখন বললাম, হোয়াট? কি? তারা প্রার্থনা করে আর মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়? প্রিস্ট বললো, হ্যা তাইতো। আমি বললাম, আচ্ছা ঠিকআছে, তারা কি রকম মিউজিক ব্যবহার করে? সে বললো, তাদের কোন মিউজিক নেই। নো মিউজিক, তুমি কিভাবে গডের প্রার্থনা করবে মিউজিক ছাড়া? ও ম্যান! এরপর আমি মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলাম, মুহাম্মদ তোমাদের কোন মিউজিক নেই? সে বললো, না নেই। আমি পিয়ানো আর অর্গানের ব্যবসা করতাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, পৃথিবীতে কতগুলো মসজিদ আছে? সে বললো, মিলিয়ন! মিলিয়ন! মিলিয়ন!............ আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাদের কোনটিতেই পিয়ানো নেই? সে বললো, নাহ! যে কোন ধরনের মিউজিক যন্ত্র? সে বললো, নাহ! আমি চিন্তা করলাম, আমি তো ধনী হয়ে যাব যদি তাদের মসজিদে মিউজিকের যন্ত্রপাতি সরবারহ করতে পারি! আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আরবদের কোন মিউজিক নেই? সে বললো, আরবদের মিউজিক আছে। আমি মনে মনে বললাম, আমি আমার পরবর্তী মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা দেখতে পাচ্ছি।

এরপর একদিন, প্রিস্টটি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলো, সে আবার মসজিদে যেতে চায়। সময়টি ছিল জুলাই মাসের মাঝামাঝি ১৯৯১। তারা এবার যে মসজিদে গিয়েছিল সেটি ছিল টেক্সাসে আর আমরা ডালাসের দক্ষিণে থাকতাম। সারা রাত আমরা তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, কিন্তু তাদের আর কোন খবর নেই! কি হল, আমরা চিন্তা করতে লাগলাম, যাই হোক, অনেক রাতে তারা ফিরে এল। যখন তারা ফিরে এল আমি মুহাম্মদকে চিনতে পারছিলাম কিন্তু পাশের জনকে চিনতে পারছিলাম না কারণ সে ছিল আরবদের মত পোষাক পরিহিত সাদা জুব্বা, মাথায় ছিল কাপড় আরবদের মত। যখন কাছে আসল, আমি বললাম, পি! প্রিস্টের নাম ছিল পিটার কিন্তু যেহেতু সে প্রিস্ট ছিল তাই আমরা তাকে ফাদার বলে ডাকতাম, নামধরে ডাকতে পারতাম না। আমি বললাম, পি, তুমি মুসলিম হয়েছ? সে বললো, আশ হাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ! আমি বললাম, ও মাই গড! আমি তার সামনে ক্যামেরা ফিট করে তার ইন্টারভিউ নিতে চেয়েছিলাম যে সে কিভাবে মুসলিম হলো, কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আমার ইন্টারভিউয়ের সময় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল! হা, হা, হা।

যাই হোক, ব্যাপারটি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। আমি এখন কি করব? আমি একজন প্রিচার যে মানুষকে ধর্মীয় কথা বলে চেন্জ করার চেষ্ট্রা করি আর এখানে একজন প্রিস্ট মুসলিম হয়ে গেল! আমার বাবা বললো, ভাল তো, তার কাছে ভাল লেগেছে সে গ্রহণ করেছে! আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি কি করব! তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলবো। আমাদের বাসা দু'তলা অ্যাপার্টমেন্ট ছিল আর আমরা দু'তলায় থাকতাম, আমি স্ত্রীকে সব খুলে বললাম, প্রিস্ট মুসলিম হয়েছে! এবং সে কুরআনের কথা বলছে! কিন্তু হঠাৎ করে আমার স্ত্রী বললো, আমি ডিভোর্স চাই! আমি অবাক হয়ে গেলাম, আমি বললাম, কি ঘটেছে? সে বললো, তোমরা ধর্ম নিয়ে কথা বলছ.... ইসলাম নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে... আমি থাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, নো নো নো এখানে কোন সমস্যা নেই! আমি শুধু তাদের পর্যকেক্ষণ করতেছিলাম, আমাকে বিশ্বাস কর, আমি মুসলিম হব না। সে তাও বললো, আমি ডিভোর্স চাই! আমি বললাম, আবার কি হল? সে বললো, একজন মুসলিম একজন খ্রিস্টানকে বিয়ে করতে পারে না। আমি তাকে বললাম, ওহ, আমার দিকে তাকাও, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি মুসলিম হব না। ঠিক আছে? সে বলেছিল, একজস মুসলিম একজন খ্রিস্টানকে বিয়ে করতে পারবে না, সুতরাং আমি তো মুসলিম হচ্ছি না, তাহলে সমস্যাটি কোথায়? সে তখন বললো, সেটাই তো সমস্যা, কারণ একজন মুসলিম নারী একজন খ্রিস্টান পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না, আমি মুসলিম হতে চাই! তাই আমার ডিভোর্সের প্রয়োজন। আমি এই মুহুর্তের কথাটি কখনো ভুলবো না, আমি চিন্তা করলাম, শেষপর্যন্ত আমি সত্য কথাটি বলতে পারব! আমি ভাবিনি যে সে মুসলিম হওয়ার বিষয়টি পছন্দ করবে। আমি তখন বললাম, ঠিক আছে, ভাল খবরটি হচ্ছে, আমিও মুসলিম হতে চাই! কিন্তু সে আমাকে বললো, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। আমি বললাম, আসলে ব্যাপারটি একটু অন্য রকম হয়ে গেছে, আমিও মুসলিম হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছিলাম, আর এখন আমরা দুই জনেই মুসলিম হবো, সুতরাং সবকিছুই আগের মত থাকবে, ঠিক আছে? কিন্তু সে বললো, হয় তুমি এখন মিথ্যা কথা বলছ বা পাঁচ মিনিট আগে মিথ্যা কথা বলেছিলে, তাই আমি কোন মিথ্যাবাদীকে বিয়ে করব না। (সো গেট আউট) বেড়িয়ে যাও!

আমি ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে নামছিলাম, তখন আমি চিন্তা করছিলাম, (ওয়েট এ মিনিট!) এটা আমার বাবার বাড়ি, আমি আমার বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব? আমি মুহাম্মদের নিকট গেলাম, তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম, আর তাকে বললাম, তোমার সাথে আমরা কথা আছে! আমার সাথে আস। আমরা বাসার বাইরে বের হলাম, গ্রামের রাস্তা ধরে হাটছিলাম, তখন ছিল সুবহে সাদিক এর সময়। আমি তাকে বললাম, কিভাবে মুসলিম হতে হয়, মুসলিমরা কিসে বিশ্বাস করে, আমাকে সবকিছু খুলে বল, আমি কোন তর্ক করতে চাই না, আমাকে সবকিছু খুলে বল! সে আমাকে সব কিছু খুলে বললো, আমি বললাম, আমরা এই পর্যন্তই জানা প্রয়োজন ছিল। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেল্লাম। সে আমাকে বললো, দেখ আমি কিন্তু তোমাকে কোন চাপ দিচ্ছি না, এটা সম্পূর্ণ তোমার নিজের ব্যাপার! তুমি নিজেই তোমার সিদ্ধান্ত নাও আমি তোমাকে জোর করতে পারি না! আমি যখন তাকে ফজরের নামাজ পড়তে দেখ লাম আমি অভিভূত হয়ে গেলাম, সে যখন সিজদায় গেল, সেই দৃশ্যটি ছিল খুবই সুন্দর। কি বিনয়, কি সুন্দর করে রাব্বিল আলামিনের কাছে আত্মসমর্পণ! আমিও তার মত করে সিজদা দিতে চাইলাম, আমি অন্য একটি রুমে গেলাম, যেখানে আমাকে কেউ দেখতে পাবে না, আমি সিজদায় চলে গেলাম, তখন আমার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই বের হল, ও গড আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর, ও গড তুমি যদি সেখানে থেকে থাক আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর! (ও গড গাইড মি! ও গড ইফ ইউ দেয়ার গাইড মি! ) আমি কতক্ষণ পর উঠে বসলাম, আমার চারদিকে তাকালাম, সেখানে কোন রেইনবো ছিল না, কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না, কোন এন্জেল ছিল না! সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। এটা ছিল টেক্সাসের অন্যান্য দিনগুলোর মতই। কিন্তু আমার ভিতরে আমি বুঝতে পারলাম, সেখানে বেশ বড় একটি পরিবর্তন ঘটে গেছে! আমি সেটি অনুভব করছি! আমি বুঝতে পারলাম আমার কি করা উচিত। আমি আমার স্ত্রী, বাবার সাথে কথা বললাম, এরপর আমি গোসল করে পবিত্র হলাম, তখন সময় ছিল, সকাল ১০টা, আমি মুহাম্মদ আর নতুন মুসলিম ইয়াহিয়া ( আগে প্রিস্ট ছিল) সামনে দাড়িয়ে বললাম, আশ হাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ! এবং ঠিক এর একটু পরেই আমার স্ত্রী শাহাদা(সাক্ষ্য) পাঠ করল, আশ হাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ! এর কয়েকমাস পর আমার বাবা সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আশ হাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ! ধীরে ধীরে আমরা অনেককেই ইসলাম গ্রহণ করতে দেখলাম।

আমরা পুরো বিশ্বকে বলতে চাই, ইসলাম কি? আমরা চাই সবাই জানুক প্রকৃত ইসলাম কাকে বলে! আমরা কিভাবে অজানা থেকে যাব এই সুন্দর ধর্ম ইসলাম থেকে? আমাদের যে দায়িত্বটি হচ্ছে, মানুষকে জানাতে হবে। আমি মসজিদের ইমামদের বলতে চাই, মানুষকে জানান, মানুষকে বলেন ইসলামের কথা। এটা আমাদের কর্তব্য মানুষকে জানানো ইসলাম সম্পর্কে জানানো। আল্লাহ আপনাদের জিজ্ঞেস করবে না যে তারা শাহাদা পাঠ করেছিল কিনা কিন্তু আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন আপনি মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌছিয়েছিলেন কিনা। আমি আপনাদের বলতে চাই, আমি হাজার হাজার মানুষকে শাহাদাত পাঠ করতে দেখেছি। আমি এটা বিতর্কের মাধ্যমে করি নি। আমি খ্রিস্টান প্রিচার ছিলাম, সুতরাং আমি উভয়দিক টিই জানি। আমি খ্রিস্টান হিসেবে প্রশ্ন করি আর মুসলিম হিসেবে উত্তর দিই। আমি এই কাজটি অনেকবার করেছি আর তাতে আমি অনেক ভাল ফল পেয়েছি। আমার কথা শেষ করার পূর্বে আপনাদের একটা ঘটনা বলি। আমি একবার হেগার্স টাউন ভার্জিনিয়ার চার্চে গিয়েছিলাম। এটি ছিল ১৯৯৯ এর ঘটনা। আমি সেখানে রবিবারদিন গিয়েছিলাম এবং বক্তব্য রেখেছিলাম আর আমি জানি খ্রিস্টানদের কিভাবে বুঝাতে হয় কারণ আমি নিজেই খ্রিস্টান ছিলাম, দুইজন মানুষ সেখানে তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের প্রিচারের সামনে, তারা বললো, আমরা বুঝতে পেরেছি আসলেই গড একজন। তাদের মধ্যে একজন ছিল সেই প্রিচারের মেয়ে! আমি আপনাদের একটা কথা বলি, আমি যদি সেখানে চার্চে বিতর্ক করে প্রিচারকে অপদস্থ করতাম তাহলে কি সে কখনও আমার সাথে কথা বলতে চাইবে? না কখনো নয়। আমি তাদের সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছিলাম যার কারণে তিনমাস পরে তারা আবার আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সেখানে গিয়ে বক্তৃতা করার জন্য। আপনাদের যে কথা বলে আমার কথা শেষ করব, আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকা, এটা আমাদের কোন কথা নয়, এটা আল্লাহর কথা আর আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত করেন। আমরা এখানে জোর করতে পারি না। আমাদের দায়িত্ব মানুষের কাছে সুন্দরভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন!


(ব্লগার আব্দুর রহমান ভাইয়ের ব্লগ থেকে সংকিলত)

মুনাফিকির করুণ পরিণতি

মুনাফিক আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো ভণ্ড, কপট বা দুই মুখো। ইংরেজিতে বলে Hypocrite (হিপোক্রিট)। ইসলামের প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য ও অন্তরে ঘৃণা করার নাম মুনাফিক। এটা কুফরির চেয়েও খারাপ ও জঘন্য চারিত্রিক অধঃপতন।
‘মুনাফিকুন’ শব্দটি ‘নিফাকুন’ শব্দ থেকে এসেছে। আর নিফাকের অর্থ হলো, দুইমুখো নীতি অবলম্বন করা, কুফরি গোপন করে নিজেকে মুমিন বলে প্রকাশ করা।
সমাজে এমন অনেক লোক দেখতে পাবেন, যারা সামান্য কিছু স্বার্থের জন্য বন্ধুবেশে শত্রুতা করে থাকে। এরা উপরে উপরে ভালো মানুষ সেজে মৌখিক বন্ধুত্ব দেখায়, কিন্তু অন্তরে থাকে এদের ভীষণ শত্রুতা। এরা কপটচারী, বন্ধুবেশে শত্রু; বরং শত্রুর চেয়েও ভয়ানক। কাফির ও অমুসলিমদের মধ্য থেকে কোনো কোনো লোক ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণের ভান করে ইসলাম ও মুসলমানদের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে থাকে। এ ধরনের দ্বিমুখী কার্যক্রমের নামই নিফাক। বাংলায় আমরা বলি ভণ্ডামি বা কপটতা।
মহান আল্লাহতাআলা নবী করিম সাঃ-কে বলেন, ‘হে নবী সাঃ! আপনি কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমে পড়ুন। আর তাদের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করুন।’ (সূরা তওবা-আয়াত-৯)
যারা এ আচরণ করে তথা মুখে ইসলাম ও ঈমানের দাবি করে এবং অন্তরে এর বিরোধিতা করে ও একে অস্বীকার ও বিরোধিতা করে তারা হলো মুনাফিক।
মুনাফিকদের বিরুদ্ধেও কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। আর মুনাফিকরা নবী সাঃ-এর উম্মতেরই পরিচয়দানকারী একটি দল। বাইরে তাদের খাঁটি মুসলমান, নবীদরদি ও ইসলামদরদি বলে মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওরা দীনের যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে।
মহান আল্লাহ তায়াআলা বলেন, হে নবী সাঃ আপনি তাদের মুনাফিকির জন্য আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন আর না-ই করুন, তাদের জন্য উভয়ই সমান। আল্লাহ তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না।
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক এমন পাপাচারী লোকদের হিদায়াত দান করেন না।’ (সূরা মুনাফিকুন - আয়াত - ৬৩)
যারা ইসলামের বিরোধিতা করে তাদের মধ্যে মুনাফিকরা জঘন্যতম। তারা কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট। তারা মুখে ইসলামের ভালোবাসার জয়গান গায় এবং অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে। তারা প্রকাশ্যে মুসলমান ও ইসলামের বন্ধু সাজে কিন্তু অন্তরে ভীষণ শত্রুতা পোষণ করে। মুনাফিকরা বৈষয়িক সুবিধা লাভ করার উদ্দেশে প্রকাশ্যে ইসলামের হিতাকাঙ্ক্ষী সাজে কিন্তু সুবিধা লাভের পর ইসলামের শত্রুতা আরম্ভ করে, তারা হলো দুই মুখো সাপ। এরা ইসলামের শত্রুদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। মুসলমানদের দুর্বলতা ও গোপনীয়তা শত্রুদের কাছে পাচার করে। নানা মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে মুসলমানদের সামাজিক ঐক্যে ফাটল ধরায়। এরা সাধারণ মুসলমানদের সমর্থন লাভ করার জন্য ইসলামের কথা বলে। ইসলামী লেবাস ধারণ করে। কিন্তু সমর্থন লাভ করার পর নেতৃত্ব পেয়ে ইসলাম ও কুরআনের বিধানের চরম বিরোধিতা করে। মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ করে। ইসলামী লেবাস পরিহার করে এবং প্রকৃত রূপ ধারণ করে। এরা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। তারা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। স্বার্থ অর্জনের জন্য তারা যেকোনো ধরনের মিথ্যা বলতে দ্বিধা করে না। পবিত্র কুরআন শরিফে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।’ (সূরা মুনাফিকুন - আয়াত - ১)

মুনাফিকরা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য একবার মুসলমানদের দলে আবার কাফিরদের দলে যোগদান করে। তাই মহান আল্লাহ বলেন, তারা কোনো দলেই স্থির থাকে না। না এ দলে, না অন্য দলে অর্থাৎ না মুসলমানদের দলে না কাফিরদের দলে।’ (সূরা নিসা - আয়াত - ১৪৩)
মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি
(১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে।
(২) যখন অঙ্গীকার করে, তখন তা ভঙ্গ করে
(৩) তার কাছে কোনো আমানত রাখা হলে তা সে খেয়ানত করে।
মুনাফিকরা ইসলামের প্রধান শত্রু। ইসলামের ক্ষতি করার ব্যাপারে তারা কাফিরদের চেয়েও ভয়ানক। মদিনার মুনাফিকরা মুসলমানদের চরম ক্ষতি করেছিল। এদের নেতার নাম ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই। সে মহানবী সাঃ-কে সব সময় বিব্রত করার অপচেষ্টা চালাত।
মুনাফিকরা অন্যের সাথে প্রতারণা করে, তারা সব সময় সন্দেহ রোগে আক্রান্ত এবং নিজেদের পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী মনে করে, কিন্তু বাস্তবে অজ্ঞ, মূর্খ ও নির্বোধ। তারা দ্বিমুখী স্বভাবের সাহায্যে মুসলমানদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তারা ভালো কথা শুনতে চায় না, ভালো কথা বলতে চায় না, ভালো কাজ দেখতে চায় না। সব সময় তারা গোপন কর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকে। এরা মিথ্যাবাদী, ইসলামকে তারা ঢালস্বরূপ ব্যবহার করে। বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা, শক্তি ও সম্পদের অহঙ্কার করে। এরা নামাজ পালনের ক্ষেত্রে অলস। লোক দেখানোর জন্য রোজা রাখে, হজ করে, কুরআন তিলাওয়াত করে, দানখয়রাত করে এবং আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলো পালন করবে। কিন্তু এগুলোর সাথে সাথে তারা মিথ্যা বলবে, ভণ্ডামি করবে, জুলুম করবে, ওয়াদা খেলাফত করবে ও আমানতের খেয়ানত করবে। কোনো হারাম হালাল বিচার করবে না। সুদ-ঘুষ গ্রহণ করে। দুনিয়ার সুখশান্তির জন্য তারা সবই করতে পারে। বাহ্যিক লেবাসে তারা মুসলিমের দাবিদার।
মুনাফিক দুই প্রকারঃ
(১) ঈমান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুনাফিক
(২) আমল ও কর্মের ক্ষেত্রে মুনাফিক।
নিজেদের অপরাধ ধরা পড়ার ভয়ে মুনাফিকরা সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। ধরা পড়লে ইহকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করে এবং পরকালে শাস্তি হিসেবে জাহান্নামের গভীরতম স্থানে অবস্থান করবে। মহান আল্লাহতাআলা পবিত্র কুরআনে তাদের শাস্তি ও অবস্থান সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান করবে।’ (সূরা নিসাঃ আয়াত -১৪৫)
মুনাফিকদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহপাক বলেন, ‘অভিশপ্ত অবস্থায় তাদের যেখানেই পাওয়া যাবে ধরা হবে এবং হত্যা করা হবে।’ (সূরা আহযাবঃ আয়াত - ৬১)

আল্লাহ পাক আরো বলেন, ‘হে নবী! কাফির ও মোনাফিকদের সাথে যুদ্ধ করো এবং কঠোরতা প্রয়োগ করো। তাদের আবাস জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত খারাপ স্থান।’ ঈমানের ক্ষেত্রে মুনাফিকি এত জঘন্য ও ভয়ানক যে, তাদের জন্য কেউ যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না।
আখিরাতে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মুনাফিকের আর একটি চিহ্ন আছে তা হলো যখন সে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়, তখন অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে।’
যারা মুখে ইসলাম ও ঈমানের দাবি করে, কিন্তু অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে এবং আল্লাহ ও রাসূলকে বিশ্বাস করে না তারা হলো মুনাফিক। এরা মিথ্যাবাদী, প্রতারক, ভণ্ড ও দ্বিমুখী নীতি অবলম্বনকারী, যার মধ্যে এ বদ অভ্যাস সব থাকবে। এরা নিকৃষ্ট, জঘন্য, কপট, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। আল্লাহ কখনো তাদের ক্ষমা করবেন না। তাই আমরা কেউ যেন কারো সাথে মুনাফিকি আচরণ না করি এবং ঈমানের সাথে চলতে পারি।
**************************
মাসুদা বেগম
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৮ জুলাই ২০০৮

মহিলাদের জামাতে সালাত

জামাতের সাথে সালাত আদায়ের জন্য মহিলাদের মসজিদে উপস্থিতির বিষয়টি তর্কাতীত নয়। এ বিতর্কটি খোদ সাহাবায়ে কিরাম রাঃ-এর যুগ থেকে চলে আসছে। এখনো মতানৈক্য চলছে। কিন্তু মহিলারা জামাতে সালাত আদায় করতে পারবেন না বা তারা যদি জামাতে সালাত আদায় করেন তাহলে সেটি শুদ্ধ হবে না­ এমন কথা কেউ বলেননি। কারণ অনেক মহিলা সাহাবি খোদ রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে জামাতে সালাত আদায় করেছেন বলে বহু হাদিসে বর্ণিত আছে।
জামাতে উপস্থিত সব শ্রেণীর মুসল্লিদের কাতার কিভাবে হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থাবলিতে বিশদ আলোচনা রয়েছে। মহিলাদের পর্দা রক্ষার্থে তাদের কাতার সবার পেছনে রাখা হয়েছে। ফরজ সালাত শেষে ঘরে ফেরার সময় যাতে মহিলাদের মুখোমুখি না হতে হয় সে জন্য পুরুষদের একটু বিলম্বে বের হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ কথাগুলো প্রমাণ করে যে, মহিলারা জামাতে সালাত আদায় করতেন। রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর যুগে মহিলারা যে জামাতে সালাত আদায় করতেন, এ ব্যাপারেও কোনো এখতেলাফ নেই। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, তোমরা আল্লাহর বাঁদিদের মসজিদে আগমন করা হতে বাধা দিয়ো না (বুখারি শরিফ প্রথম খণ্ড ও মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড)। ঈদের জামাতে মহিলাদের উপস্থিতিকে রাসূলুল্লাহ সাঃ খুবই উৎসাহিত করতেন। কারো পর্দার জন্য জিলবাব বা গাউন না থাকলে অন্যেরটি পরেও উপস্থিত হওয়ার জন্য তিনি পরামর্শ দিতেন। এমনকি ঋতুবতী মহিলা যারা সালাত আদায়ের অনুপযুক্ত তাদেরও ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে খুতবা ও দোয়ায় শরিক হওয়ার কথা বলতেন (বুখারি শরিফ প্রথম খণ্ড ১৩৩, মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড ২৯০)। একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, মহিলারা সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যাবে না। (মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড ১৮৩)।
এই হাদিস এবং এ ধরনের হাদিসগুলোর আলোকে ইমাম নাওয়ারি বলেন, মহিলাদের মসজিদে যেতে বাধা দেয়া যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। তা হলো মহিলা কোনো ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যাবে না, সাজগোজ করে নয়, এমন কঙ্কন পরে নয়, যা থেকে ধ্বনির সৃষ্টি হয়। পুরুষদের সাথে মিলেমিশে মসজিদে উপস্থিতি নয় বা এ ধরনের যেকোনো আচরণ যা ইসলামি শালীনতা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী হয়। (সহি মুসলিম প্রথম খণ্ড ১৮৩)।
সার্বিক আলোচনা থেকে যা বেরিয়ে আসে তা হলো আমরা যেভাবে মহিলাদের মসজিদের ধারে কাছে যেতে দিই না, তা হাদিসের আলোকে যথার্থ নয়। আবদুল্লাহ ইবন উমার রাঃ একদা রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর হাদিস বর্ণনা করছিলেন যে, মহিলাদেরকে রাতে মসজিদে যেতে দিয়ো। তাঁর এক ছেলে বেলাল তখন বলে উঠল, আমি যেতে দেব না। আবদুল্লাহ রাঃ তখন তার বুকে আঘাত করে বললেন, আমি বর্ণনা করছি­ রাসূলল্লাহ সাঃ বাধা না দিতে বলেছেন আর তুমি বলো বাধা দেবে (মুসলিম প্রাগুক্ত)। মহিলাদের মসজিদে যাওয়া না যাওয়ার বিতর্ক হতে যে বিষয়টি বের হয়ে আসে তাহলো জামাতে তাদের সালাত আদায় করার অবকাশ রয়েছে। হয়তো স্থান, কাল, পাত্র ভেদে এতে দ্বিমতেরও অবকাশ রয়েছে। মা আয়েশা রাঃ নিজেই রাসূল্লাহ সাঃ-এর সাথে মসজিদে জামাতে সালাত আদায় করতেন। ফজরের ওয়াক্ত সম্পর্কে তিনি বর্ণনা করেছেন, মুমিন মহিলারা রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর সাথে ফজরের সালাত এমন সময় আদায় করে ঘরে ফিরতেন অন্ধকারের কারণে তাদেরকে চেনা যেত না (বুখারি শরিফ প্রথম খণ্ড ১২০, মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ড ২৩০)। এই আয়েশা রাঃ শেষ জীবনে মহিলাদের চাল-চলনের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ মহিলাদের এখনকার অবস্থা দেখলে তাদের মসজিদে আসা থেকে নিষেধ করতেন। (সহিহ মুসলিম প্রথম খণ্ড ১৮৩)। এ থেকে বুঝা যায়, তার এ অভিমতটি ছিল কালের সাথে সম্পর্কিত। এ যুগে মহিলারা অফিস করছেন, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যাচ্ছেন, স্বামীর সাথে বাজার করছেন। সালাতের সময় হলে তারা তা আদায় করবেন কোথায়। তাদের জন্য মসজিদে উপস্থিত হয়ে সালাত আদায় করলে অন্যায় হবে? বয়স্ক মহিলারা মসজিদে উপস্থিত হয়ে ওয়াজ-নসিহত ও খুতবা শুনলে ভালো ছাড়া মন্দ কোথায়? মসজিদে মহিলাদের স্বতন্ত্র সালাতের স্থান থাকলে এবং পুরুষরা রাস্তায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে জামাতে সালাতই তো উত্তম হয়।
শত শত এমনকি হাজার হাজার মহিলা মাদ্রাসা, কলেজ ও ভার্সিটির হলে বাস করছেন। তারা যদি নির্দিষ্ট সময়ে এক সাথে জামাতে সালাত আদায় করেন তাহলে তাদের জীবনে নিয়মানুবর্তিতা অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। অফিসের মহিলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জামাতে সালাতের আওতায় আনা যায় তাহলে নামাজির সংখ্যা বাড়বে বৈ কমবে না। জামাতে সালাত এমন একটি পন্থা যা মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। কোনো কোনো কল-কারখানায় দেখা যায় পুরুষদের জন্য জামাতে সালাতের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মহিলাদের একত্রিত করে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা নেই। এটি হওয়া উচিত নয়। কোনো কোনো হাদিসে বর্ণিত আছে, মহিলাদের জন্য উত্তম হলো­ তাদের গৃহে সালাত আদায় করা। এটি সেইসব মহিলার জন্য প্রযোজ্য, যারা নিজ বাসগৃহের বাইরে আসেন না বা তাদের আসার প্রয়োজন হয় না। জাগতিক শিক্ষার এই চরম উৎকর্ষতার যুগে মহিলাদের ইসলামের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করা ইসলামি ধ্যান-ধারণার প্রতি উজ্জীবিত করা উলামায়ে কেরামের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করে অগ্রসর হওয়া সমাজ আশা করে।

**************************
ফয়সল আহমদ জামালী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৫ আগষ্ট ২০০৮

মাদ্রাসায় মোবাইল ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

প্রযুক্তি আল্লাহতায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। যা পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ আজ চাঁদ জয় করেছে, মঙ্গল ছুঁয়েছে। পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনেছে ঘরে বসে। যা কিছু মানুষ আগে ভাবতেও সাহস পেত না, তা আবিষ্কার করে দেখিয়ে দিয়েছে প্রভু মানুষকে কত জ্ঞানশক্তি দিয়েছেন। প্রযুক্তিকে নেয়ামত ভাবেন এমন লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে বেদাত, হারাম উক্তিকারীদের দল ছোট হলেও তারা শক্তিশালী। এখনও অনেক মসজিদে মাইক নিষিদ্ধ। আজান, নামাজ হয় কণ্ঠসুরে।


প্রযুক্তি নেয়ামতের প্রচণ্ড শক্তিশালী এক অধ্যায়ের নাম মোবাইল। এক সময় মানুষ মোবাইল ব্যবহার করত বিশেষ শখে কিংবা বিলাসের জন্য। তারপর প্রয়োজনে। আর এখন জীবনের জন্য অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মোবাইল। পূর্ণ একজন মানুষের জন্য দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ যেমন দরকার, ঠিক তেমনি প্রয়োজন সঙ্গে একটি মোবাইলের। তাই যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার আদীব হুজুর মাওলানা শফিকুল ইসলাম একদিন বলেন, ‘এখন যদি মোবাইলগুলো সব বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে মানুষ ছটফট করে মরে যাবে।’

আবশ্যকীয় এই জীবনোপকরণটি নিয়ে আমাদের শিক্ষাঙ্গনে বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছে ইদানীং। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলো নিয়ে বলছি। যেখানে ছাত্রদের জন্য মোবাইল ব্যবহার করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ, নাজায়েজ। মোবাইলবিরোধী শক্ত আইন জারি করা হয়েছে সব মাদ্রাসায়। ধরা পড়লে কর্তৃপক্ষ তা বাজেয়াপ্ত করে। ধমক, চোখ রাঙানি, চড়-থাপ্পড় থেকে নিয়ে শক্ত পিটুনি, বোর্ডিং থেকে খাবার বন্ধ, ক্লাসে বসার অনুমতি না দেয়া এমনকি বহিষ্কারের মতো দুঃখজনক ঘটনাও শোনা যায় নিয়মিত। এসব মাদ্রাসায় যেমন পত্রিকা পড়া নিষেধ, বাংলা নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া বারণ, ইংরেজি মানা, স্বাধীনতা দিবস-বিজয় দিবস নিয়েও ভিন্ন ভাবনায় যাওয়া যায় না, এমনই একটি নিষেধাজ্ঞা আছে মোবাইল ব্যবহার করা নিয়ে। অবাক করার কথা হল, এত উত্তাপময় নিষেধাজ্ঞার পরও একটি মাদ্রাসার একটি ক্লাসও পাওয়া যাবে না, যেখানে মোবাইল নেই। লুকিয়ে লুকিয়ে কম-বেশি প্রতিটি ক্লাসের ছেলেরাই আধুনিক এই আবিষ্কারটি ব্যবহার করছে। নানা মডেলের মোবাইল এখন তাদের হাতে হাতে। যা মানা বা মানানো সম্ভব না, এমন একটি আইন চালু হওয়ায় ছাত্ররা ঝুঁকি নিয়ে আইন ভাঙছে নিয়মিত। স্বভাবতই একজন শিক্ষার্থী যখন একটি আইন ভাঙতে বাধ্য হয় কিংবা সাহস পায়, তখন আরও দুটি আইন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে তার বুক কাঁপে না। সাহস বেড়ে যায় অনেক বেশি। দুষ্ট ও বেআদব হয়, সম্মান ও আস্থা হারায় মাদ্রাসার আইনের প্রতি। এই একটি কারণেই শিক্ষার্থীদের সারাক্ষণ দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফেরে। আতংকে ভোগে তারা, না জানি কখন ধরা পড়ে যাই। আবার শিক্ষক জিজ্ঞেস করলে শাস্তি কিংবা মোবাইল খোয়া যাওয়ার ভয়ে মিথ্যে পর্যন্ত বলে ফেলে কেউ কেউ। মোবাইলকে জোর দিয়ে ‘না’ বলে দিলেও বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিকল্প কিছুর কথা সঙ্গে বলে দেয়া হয় না। এমনও অভিযোগ আছে, মাদ্রাসা দফতরে ফোন দিলে ডেকে দেয়ার ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য বলে দেয়া হয় অমুক তো মাদ্রাসায় নেই বা খেলতে গেছে। এদিকে বাড়ির সবাই আঁৎকে ওঠে, পেরেশান হয়। এসব কারণেই কি তাহলে ছাত্ররা আইন ভেঙে হাতে মোবাইল তুলে নিচ্ছে? প্রয়োজনে মিথ্যার আশ্রয়ও নিচ্ছে। যদিও তারা কোরআন-হাদিসের শিক্ষার্থী?
অবশ্য মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মোবাইলবিরোধী একচেটিয়া আইন করার পেছনে কিছু কারণ পাওয়া যায়। সময়ের বন্ধু একটি মোবাইলে ইন্টারনেটে কি নেই, যা একজন তরুণকে বিপথগামী করতে পারে? মাদ্রাসার ছাত্ররা সাধারণত মা-বাবা বা পরিবারের সঙ্গে থাকে না। থাকে নিজেদের মতো কিছু পারিবারিক বাঁধনমুক্ত অবিবাহিত তরুণের সঙ্গে হোস্টেলে। এমন ছেলেদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়ার কথা বললে ভুল হবে। ঘটনা আছে, এক ছেলে হাদিসের ক্লাসে হঠাৎ ‘আউট’ বলে চিৎকার করে ওঠে। সহপাঠী, শিক্ষক সবাই অবাক- কি হয়েছে। কি হয়েছে! পরে মাথায় আবৃত রুমাল খুলে দেখা যায় কানে তার মাইক্রোফোন। রেডিওতে চলছে মাদকময় ক্রিকেট। কিছু ছেলে আছে যারা সারাদিন ক্লাসে ঝিমায়, ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু। অথচ রাত পাড়ি দিচ্ছে বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে খোশগল্প করে, তারা সুযোগ পেলে মোবাইলে অশ্লীল চিত্র দেখে কাতুকুতু অনুভব করে। এমন মানুষও আছে, যাদের বোর্ডিংয়ে বাকি পড়ে রয়েছে, মাদ্রাসার বেতন বা ক্লাসের চাঁদা দেয়নি অথচ তার মোবাইলে ঠিকই কার্ড ঢোকানো হচ্ছে। ছাত্রদের এমন কিছু অমার্জনীয় কর্মকাণ্ডের কারণেই কতৃêপক্ষ এমন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। তাই সবদিক বিবেচনা করে মনে হয় ছাত্রদের এ ব্যাপারে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া যেমন ঠিক না, তেমনি মোবাইলবিরোধী একপেশে আইন চাপিয়ে দেয়াও বোকার স্বর্গে বাস করার নামান্তর। কেননা প্রমাণিত সত্য হল, এখন আর মোবাইলকে নানা রকম আইন-কানুন করেও ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। দেশের বড় বড় দলও তো মাঝে-মধ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। আবার জনগণের পরামর্শে, চাপে কষ্ট হলেও ঠিক পথে আসে। কওমি মাদ্রাসাগুলো কি পারবে আইনটি সংশোধন করতে?

মোবাইল ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং সংকট সমাধানে তাদের পরামর্শ জানতে যোগাযোগ করি দেশের সেরা কওমি মাদ্রাসাগুলোয়। প্রশ্নের জবাবে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ সব কথা। ঢাকার মাদানীনগর মাদ্রাসার ছাত্র মাহমুদ বললেন, ‘কেবল কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কথা উঠবে কেন? পুরো শিক্ষাঙ্গন নিয়ে আলোচনা হতে পারে- স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা। সত্যি কথা হল, কোথাও মোবাইলের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।’
যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার জালালাইন জামাতের ছাত্র তানবিরের (ছদ্মনাম) প্রতিক্রিয়া বেশ ক্ষুব্ধ। বলল, ‘নিষেধ করুক বা না করুক মোবাইল ব্যবহার করব। নিলেগা আরেকটা আনব।’ বেশ সুন্দর উত্তর দিয়েছেন চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসার হুমায়ুন আইয়ুব। ‘ছাত্র-শিক্ষক উভয় পক্ষেরই নমনীয় ভাব বজায় রাখা জরুরি। যেহেতু সবারই প্রয়োজন, তাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলেও মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সময় পেরিয়ে গেলে সব মোবাইল জমা নিতে পারে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ ছাত্রদের হাতে মোবাইল থাকার পক্ষে আমি মত দেব না। আর তাদের ব্যবহৃত সেটগুলো অবশ্যই কম দামি, ভিডিও ক্যামেরামুক্ত হতে হবে।’ পাহাড়ি এলাকা চট্টলার ছাত্র যুবায়ের আহমদ, মুজহিরুল উলুমে অধ্যয়নরত ঢাকার এই তরুণ বলল, ‘মোবাইল আসলে অবৈধ নয়। বরং আইন হয়েছে বেপরোয়া ভাবটা কাটানোর জন্য। কেননা, হুজুরদের ছেলেদের হাতে মোবাইল আছে। সেই মোবাইলে কল দিয়ে ছেলেকে ডাকছেন বাবা।’ ক্লাসভিত্তিক মোবাইলের ব্যবস্থা থাকলে সুন্দর হয় বলে পরামর্শ দিয়েছেন জামিয়া আরাবিয়া সাভারের ছাত্রী আলিমা আক্তার। ঢাকার হাফেজ আতিক বলেন, এটা একটা কাদাময় বিষয়। হাত দিলেই কাদা লাগবে। ছাত্রের গায়ে, শিক্ষকের গায়েও। তাই আমি চুপ, কথা বলব না। জামিয়া উসমানিয়া চাটখিল, নোয়াখালীর ছাত্র হাফেজ মুমিনুল্লাহ বললেন, ‘মোবাইল ছাত্রদের জন্য ক্ষতিকর। তবু প্রচণ্ড প্রয়োজনে লুকোচুরি করে ব্যবহার করছি।’

এ ব্যাপারে শিক্ষকের বক্তব্য কী, জানতে হাজির হই ঢাকার মালিবাগের প্রধান শিক্ষক মাওলানা নাসীম আরাফাতের বাসায়। জাঁদরেল এই আলেমের মত হল, ছাত্রজীবনে মোবাইল ব্যবহার করা একদম হারাম। জীবনকে নষ্ট করে দেবে ওটা। আমি তো ছাত্র, ব্যবসায়ী না যে আমার সঙ্গে হাজার মানুষ যোগাযোগ করবে। একান্ত প্রয়োজনে তারাই সময় ঠিক করে নেবে। আমার মনে হয়, যে নিজের জন্য প্রয়োজন মনে করে, তার জন্যই প্রয়োজন। যে প্রয়োজন মনে করে না তার জন্য প্রয়োজন নেই। এটা একটা আপেক্ষিক বিষয়। আমার মোবাইল নেই, আমি কিন্তু কোন অসুবিধা ভোগ করছি না। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করারও তো প্রয়োজন নেই। সবাই বলে এতে পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। মোবাইলও তো একই সমস্যা বহন করে। তাহলে মোবাইল নিষিদ্ধ হতে বাধা কোথায়। সীমা অতিক্রম করলে আমরা ছাত্রদের ধরি। নতুন আইন হয়। সব আইন তো আর একশ’ভাগ আদায় করা যায় না। যতটুকু সম্ভব ওস্তাদরা সজাগ থাকেন। প্রায় সব ছেলেই এই আইন মেনে চলছে। কিছু তো উচ্ছৃংখল, দুষ্ট থাকবেই, সব জায়গাতেই থাকে। আমাদের আকাবেররা কোন চিঠিও পড়তেন না। তাই বলে কি তারা সময় সচেতন ছিলেন না? কথা হয় দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রবীণ ও প্রথম সারির শিক্ষক মাওলানা শোয়াইব আহমদের সঙ্গে। ‘মোবাইলবিরোধী আইন আছে। তাই চোখে পড়লে বা জানতে পারলে তা আটক করি। গোপনে ব্যবহারের শিথিলতাটুকু অবশ্য কেউ কেউ নিচ্ছে।’ এমন উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। তার এই জবাবে কথা থেকে যায়, তাই জানতে চেয়েছিলাম হুজুরদের বিশেষ খাদেম এবং ছেলেরা এমনকি আপনার সন্তানও তো মাদ্রাসায় মোবাইল ব্যবহার করছে এটা দেখেও কেন দেখছেন না? অথচ অতিসম্প্রতি আটক করা সাধারণ
ছাত্রদের অসংখ্য মোবাইল আপনাদের হাতে বাজেয়াপ্ত, তাদেরগুলো ফেরত দেন না কেন?
এমন প্রশ্নের জবাবকে তিনি চতুরতার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে যান। কথার মাঝে ভিন্ন সুর তোলেন। অন্যের প্রতি কঠিন হৃদয়ের হলেও নিজের সন্তান, খাদেমদের ওপর আইনের শাসন নিশ্চিত করতে অক্ষম এমন একচোখা লোকই মাদ্রাসার বদনাম করেন। হাটহাজারীসহ দেশের সব মাদ্রাসা থেকে এসব দ্বৈত নীতির অবসান ঘটুক। মাদ্রাসাগুলোতে চালু হোক ভারসাম্যপূর্ণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আইন। মাদ্রাসাগুলো সৃষ্টি করুক নূরানী অন্তরওয়ালা প্রসারিত দৃষ্টির প্রজন্ম, যারা নেতৃত্ব দিতে পারবে দেশের এবং বিশ্বের। তারাই হতে পারবে ইমাম মাহদীর রুহানী সৈনিক।

**************************
তা জু ল ফা ত্তা হ
যুগান্তর, ০১ আগষ্ট ২০০৮

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা

ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে রোজার স্থান তৃতীয়। পৃথিবীর সকল ধর্মে কম-বেশি রোজার প্রচলক আছে। প্রতি বছর আমাদের মাঝে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে উপস্থিত হয় পবিত্র মাহে রমজান। উদ্দেশ্য আমরা যেন আমাদের মনের সকল লোভ-লালসা, কামনা, বাসনা, শঠতা, হিংসা, বিদ্বেষ পরিহার করে উন্নত চরিত্র অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। সাথে সাথে দেহ-মনকে পুত ও পবিত্র, সুস্থ ও সবল রেখে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারি। রোজা এমন একটি ইবাদত যা কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রাখা হয়।
তাই রোজা স্বভাবতই বান্দাকে আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণের দিকে নিয়ে যায়। তাই রোজার অনুশীলন ব্যক্তির অন্তরে প্রশান্তি, তৃপ্তি এবং ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণের আশার এক অনুপম অনুভূতি সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয় বর্তমানে অনেক দুরারোগ্য রো যেমনঃ হৃদরোগ, চর্ম রোগ, বাত, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্থূলকায় রোগী, জ্বর, শ্বাসকষ্ট রোগ ইত্যাদি নিরাময়ে রোজা রাখার উপদেশ দেয়া হচ্ছে। রোজা এই সমস্ত রোগের কষ্ট দূর করে। রোজা রাখার ফলে শরীরের মধ্যস্থিত অনেক ক্ষতিকারক টক্সিনের বিষক্রিয়া থেকে শরীর রক্ষা পায়। এ অতি স্বাভাবিক ও অত্যন্ত কার্যকরী এই পন্থায় দেহাভ্যন্তরে বিধৌত ও পরিচ্ছন্ন হয়। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ এ সম্পর্কে অনেক ত্যাগ রাখতেন। তাই জ্বর হলে বলতেন “জ্বর হলে খেওনা, তাহলে ও ছুটে পালাবে”। বাস্তবিকই প্রাকৃতিক চিকিৎসায় এই আধুনিক পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আজকের আলোচনায় রোজা সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ইচ্ছা রাখি।
প্রখ্যাত স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ডাঃ শেলটন তার “সুপিরিয়র নিউট্রিশন” গ্রন্থে বলেছেন- উপবাসকালে শরীরের মধ্যস্থিত, প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করা জাতীয় পদার্থসমূহ স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোতে পুষ্টি বিধান হয়। এই পদ্ধতিকে “এ্যান্টো লিসিস” বলা হয়। এর ফলে শরীরে উৎপন্ন উৎসেচকগুলো বিভিন্ন কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হচ্ছে শরীর বিক্রিয়ার এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। রোজা এই পদ্ধতিকে সহজ, সাবলীল ও গতিময় করে। ভেষজের জনক হিপ্লোক্র্যাটন দু’ হাজার চারশ’ বছর আগে বলেছিলেন “খাদ্য তোমার রোগের ওষুধ”। অর্থাৎ খাদ্যকে আয়ত্ত করার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ হতে মুক্তি পাওয়া যায়। আর এই আয়ত্ত করার অন্যতম মাধ্যম হলো রোজা। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ওষুধ ও শল্য চিকিৎসার প্রখ্যাত ডাঃ অ্যালেকসিস বলেছেন, পুনঃ পুনঃ নিয়মিত এবং বেশি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ এমন এক শরীর বৃত্তয় ক্রিয়ায় বাধাদান করে যা মানব প্রজাতির ঊর্ধ্বতন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোজার উপবাসের মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। আভ্যন্তরীণ দেহ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিণ্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়। এ ছাড়া মানুষের শরীরে থাকে অনেক ধরনের রোগ। এ রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও রোজা অনেক উপকার করে। যেমনঃ-
বহুমূত্র রোগঃ মোটা লোকের বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা খুব উপকারী। ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধারে ১৫ দিন রোজা রাখলে বহুমূত্র রোগের অত্যন্ত উপকার হয়। চর্বিযুক্ত বস্ত্রমূত্র রোগীকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ওজন কমাতে বলা হয়েছে। কোন ওষুধ না খেয়ে শুধুমাত্র রোজা রাখার মধ্যমেও বহুমূত্র রোগ নিরাময় হয়।
চর্মরোগঃ রোজা চর্ম রোগের জন্য খুবই উপকারি।পুষ্টির সঙ্গে চর্মরোগের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তাই চর্ম রোগের কিংবা ত্বকের উপর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রোজা খুবই ফলদায়ক পদ্ধতি। আধুনিক চিকিৎসকগণ এমত পোষণ করে থাকেন।
কিডনীর পাথর কণা ও চুনঃ অনেকের কিডনী সমস্যা আছে। অথবা কিডনীতে পাথর ও চুন হয়। রোজা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে বিধায় তারা রোজা রাখেন না। অথচ আধুনিক ডাক্তারগণ বলেছেন রোজা রাখলে কিডনীতে সঞ্চিত পাথর কণা ও চুন দূরীভূত হয়। রোজাদারগণ যদি বেশী পানি পান করে তাহলে প্রস্রাবের নালি ধুয়ে পরিষ্কার হয় এবং নালি পথ প্রশস্ত হওয়া ছোট পাথর কণা নিঃসরণে সুবিধা হয়। ধমনীতে উচ্চচাপ জনিত কষ্টঃ রোজা রাখলে শরীরের ওজন কমে। শরীরের মধ্যে যে সমস্ত লবণ প্রবেশ করে সেই লবণগুলি রক্ত চাপ বাড়ায় তাই রোজা সেই লবণের পরিমাণ কামায় ফলে হ্নদপিণ্ডের উপর চাপ কম হয়। যে সমস্ত রোগী ধ্বমনিতে উচ্চ চাপের জন্য কষ্ট পাচ্ছেন তাদেরকে দৈনিক খাদ্যের পরিমাণ কমাতে হবে। এতে রোজার বিকল্প নেই। সুতরাং বুঝা গেল রোজা ধ্বমনিতে উচ্চচাপ জনিত কষ্ট দূর করে। ওজন বৃদ্ধিঃ এটা কোন জটিল রোগ নয় বরং অনেক রোগের কারণ। প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্য মানুষের দিনে তিন বার খাবার প্রয়োজন। বার বার খাদ্য গ্রহণ ফলে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, অতিরিক্ত খাদ্য চর্বি হিসাবে দেহে জমা হয়, ফলে ব্যক্তির ওজন বৃদ্ধি পায়। পেশি সঞ্চালন হয় না বললে চলে। রক্তচাপ বাড়ে তাই মোটা লোকেরা ধ্বমনির উত্তেজনা জনিত বহু কষ্টে ভোগে। তাছাড়া ওজন বৃদ্ধি শ্বাস কষ্ট সৃষ্টি করে, ফুস ফুস ও হ্নদপিন্ডকে দুর্বল করে। তাই রোজা উক্ত রোগের সর্বোত্তম প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধিঃ স্নায়ুতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং স্মৃতি শক্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করতে রোজা বিশেষ উপকার করে। চিকিৎসকগণের মতে স্নায়ুতন্ত্রের উপর রোজার ক্রিয়া মরিচা পরিষ্কার করার জন্য লোহার ব্রাশের মত। রোজা স্নায়ুতন্ত্রে কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে, তাই রোজা জীবনের অনেক অনেক মারাত্মক রোগ দূর করতে সক্ষম। অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগঃ রোজা হল অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগের উত্তম নিরাময় পদ্ধতি আমিষ ও শর্করা জাতীয় খাদ্য গেঁজে ওঠার ফলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। রোজা রাখলে অন্ত্রে সঞ্চালন হয় এবং বিভিন্ন পাচক রস নিঃসৃত হয় ফলে আন্ত্রিক সময়ের জন্য তৎপর রাখে। ফলে তার কর্ম ক্ষমতা কমে যায় ও খাদ্য পরিপাকে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ জন্য খাদ্য গেঁজে ওঠে ও কতগুলো উত্তপ্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। রোজা উক্ত খাদ্যকে পাচিত করে তাই উপরোক্ত ব্যাধি হতে রোজা দ্বারা সহজে নিরাময় পাওয়া যায়।
মেদ বৃদ্ধি জনিত রোগঃ মেদ বৃদ্ধি জনিত রোগ নিরাময়ে রোজা উত্তম চিকিৎসা। মেদ বৃদ্ধি বিশেষতঃ রক্তে কোলেষ্টল বেশী হলে হ্নৎপিন্ড ধমনির উপর বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ধমনির অন্যান্য রোগ যেমন-থ্রম্বসিস হয়। যার কারণে রোগীর হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যঃ যারা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে ভোগেন, রোজা তাদের জন্য খুবই উপকারী। এক রাতে তিনবার আহার করায়,প্রচুর শরবত পান করায় এবং যথেষ্ট বুট ভাজা দিয়ে ইফতারি করায়, সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যায়।
স্থূলকায় রোগীঃ রোজা দ্বারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় স্থূলকায় লোকেরা। উচ্চবিত্ত পরিবারে কিছু সংখ্যক স্থূলকায় লোক দেখা যায়, যারা শুধু ভালো ভালো খাবার পছন্দ করে, বার বার খায় এবং শুধু খাওয়ার জন্যই তারা বেঁচে থাকে। ফলে তাদের শরীরে চর্বি জমা হয় এবং তারা এক পর্যায়ে অস্বাভাবিক মোটা হতে থাকে। এই চর্বি যে শুধু চামড়ার নিচেই জমা হয়, তা নয়, বরং চর্বি কোলেস্টরল আকারে শিরা-উপশিরা, ধমনী এবং হ্নদপিন্ডে জমা হয়। ফলে তাদের শরীরে রক্ত চলাচলে ব্যাহত হয়। ফলে এক দিকে উচ্চ রক্ত চাপের সৃষ্টি হয়। অন্য দিকে শরীরের টিসুগুলো ঠিকমত পুষ্টি পায় না, যার জন্য রোগীর ভোগান্তি চলতে থাকে। এই ধরনের লোকের জন্য রমজানের রোজা অত্যন্ত উপকারি। রোজার দিনগুলোতে বাধ্যতামূলক অনাহারের ফলে শরীরের জমানো কোলেস্টেরলগুরো শরীরের কাজে ব্যবহ্নত হয়ে পরিমাণে কমে যায়। যার ফলে রক্তের সার্কুলেশন স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং এতে রোগীর রোগ বৃদ্ধি পায়। মাহে রমজানুল মোবারক আসলেই অনেকে চিন্তায় পড়ে যান এই কারণে যে, রোজা রাখলে নাকি স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোজায় কারো স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা রোজা রেখে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কোনও রোজ দারের মৃত্যু হয়েছে, এমন কোন ঘটনা ঘটেছে বলে অন্ততপক্ষে আমার জানা নেই। রমজান মাসের পরে দেখা যায় যে, যার যেরূপ স্বাস্থ্য ঠিক সেইরূপ আছে। এর পিছনে কারণও আছে। আসলে রোজার দিনে আমরা যে খুব একটা কম আহার করছি তা নয়, বরং কিছুটা ভালো ভালো এবং পুষ্টিকর খাদ্য খাচ্ছি। অন্য সময়ের মতো রোজার দিনে আমরা ৩ বারই আহার করি। পার্থক্য শুধু সময়ের ব্যবধানে। রমজান ভিন্ন অন্য মাসে আমরা ৬ থেকে ৮ ঘন্টার ব্যবধানে খানা খেয়ে থাকি, যা স্বাস্থ্যসম্মত। কিন্তু রোজার সময় সাহরি থেকে ইফতারি পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৪ ঘন্টা, যার জন্য আমাদের সাময়িক কষ্ট ভোগ করতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে একদিকে যেমন আমরা ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করি, তেমনি অর্থাভাবে, অনাহারে থেকে গরীবরা ক্ষুধার জ্বালায় কিরূপ কষ্ট পায় সেটা অনুভব করা সহজ হয়। পাশাপাশি তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার সৎ ইচ্ছা জাগ্রত হয়। যা আমাদের উপর রোজা ফরয হওয়ার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য। তাই আমাদেরকে রোজার উদ্দেশ্যের কথা স্মরণে রেখে যথানিয়মে মাহে রমজানের রোজাগুলো রাখতে হবে। তা না হলে পরজগতে আল্লাহর বিধান অমান্য করার অপরাধে আমাদের অপরাধী হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।

**************************
মু হা ম্ম দ বা য়ে জী দ হো সা ই ন সা লে হ্‌
দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৮

বিদায় হজের ভাষণ.............

শুক্রবার, ৯ জিলহজ, ১০ হিজরী সনে আরাফার দিন দুপুরের পর রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষাধিক সাহাবির সমাবেশে হজের সময় এই বিখ্যাত ভাষণ দেন। হাম্‌দ ও সানার পর স্বীয় ভাষণে ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নেই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।


আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। আর তিনি একাই বাতিল শক্তিগুলো পরাভূত করেছেন।

হে আল্লাহর বান্দারা! আমি তোমাদের আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর বন্দেগির ওসিয়ত করছি এবং এর নির্দেশ দিচ্ছি।

হেল লোক সকল! তোমরা আমার কথা শোন। এরপর এই স্থানে তোমাদের সাথে আর একত্রিত হতে পারব কি না জানি না।
হে লোক সকল! আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, হে মানবজাতি! তোমাদের আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে পয়দা করেছি এবং তোমাদের সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর দরবারে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করে, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখে। ইসলামে জাতি, শ্রেণীভেদ ও বর্ণবৈষম্য নেই। আরবের ওপর কোনো আজমের, আজমের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদার ভিত্তি হলো কেবলমাত্র তাকওয়া।

আল্লাহর ঘরের হিফাযত, সংরক্ষণ ও হাজিদের পানি পান করানোর ব্যবস্থা আগের মতো এখনো বহাল থাকবে।
হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকরা! তোমরা দুনিয়ার বোঝা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন আল্লাহর সামনে হাযির না হও। আমি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের কোনোই উপকার করতে পারব না।
যে ব্যক্তি নিজের পিতার স্থলে অপরকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, নিজের মাওলা বা অভিভাবককে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে মাওলা বা অভিভাবক বলে পরিচয় দেয় তার ওপর আল্লাহর লা’নত।

ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। প্রত্যেক আমানত তার হকদারের কাছে অবশ্যই আদায় করে দিতে হবে।

কারো সম্পত্তি সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারো জন্য হালাল নয়। সুতরাং তোমরা একজন অপরজনের ওপর জুলুম করবে না। এমনিভাবে কোনো স্ত্রীর জন্য তার স্বামী সম্পত্তির কোনো কিছু তার সম্মতি ব্যক্তিরেকে কাউকে দেয়া হালাল নয়।

যদি কোনো নাক, কান কাটা হাবশি দাসকেও তোমাদের আমির বানিয়ে দেয়া হয় তবে সে যত দিন আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, তত দিন অবশ্যই তার কথা মানবে, তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে।

শোনো, তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথারীতি আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে, স্বেচ্ছায় ও খুশি মনে তোমাদের সম্পদের জাকাত দেবে, তোমাদের রবের ঘর বায়তুল্লাহর হজ করবে আর আমিরের ইতা’আত করবে, তা হলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।

হে লোক সকল! আমার পর আর কোনো নবী নেই, আর তোমাদের পর কোনো উম্মতও নেই।

আমি তোমাদের কাছে দু’টো জিনিস রেখে যাচ্ছি। যত দিন তোমরা এ দু’টোকে আঁকড়ে থাকবে, তত দিন তোমরা গুমরাহ হবে না। সে দু’টো হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত।
তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা দীনের ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ির দরুন ধ্বংস হয়েছে।

এই ভূমিতে আবার শয়তানের পূজা হবে এ বিষয়ে শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তোমরা তার অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়বে। এতে সে সন্তুষ্ট হবে। সুতরাং তোমাদের দীনের বিষয়ে তোমরা শয়তান থেকে সাবধান থেকো। শোনো, তোমরা যারা উপস্থিত আছো, যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে এই পয়গাম পৌঁছে দিয়ো। অনেক সময় দেখা যায়, যার কাছ পৌঁছানো হয় সে পৌঁছানেওয়ালার তুলনায় অধিক সংরক্ষণকারী হয়।

তোমাদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তখন তোমরা কী বলবে? সমবেত সবাই সমস্বরে উত্তর দিলেনঃ আমরা সাক্ষ্য দিব, আপনি নিশ্চয় আপনার ওপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, রিসালতের দায়িত্ব যথাযথ আনজাম দিয়েছেন এবং সবাইকে নসিহত করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে পবিত্র শাহাদাত অঙ্গুলি তুলে আবার নিচে মানুষের দিকে নামালেন।
হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। হে আল্লাহ। তুমি সাক্ষী থাকো।

দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২১ মার্চ ২০০৮

অনন্য উপলব্ধি ...............

পুর্বাকাশে নরম সুর্যের মতো তাঁর অবস্হান। সবার মাঝে তিনি বসে আছেন। সাহাবিরা তাঁর আশপাশে, মুখোমুখি। আলোর চারপাশে আলোপিয়াসীদের তৃষ্ণার্ত উপবেশন। ভোরের স্নিগ্ধ সৌরভের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ পবিত্রতা মজমাকে ঘিরে রেখেছে। তিনি সবার দিকে চোখ ফেলছেন, কথা বলছেন, শুনছেন কারো কারো কথা! তাঁর খুব কাছাকাছি বসে আছেন এক সাহাবি; যার গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণ। অদুরে অন্য অনেকের মাঝে আছেন আবু জর (রা.)।


অকস্মাৎ আবু জর, কালো বর্ণের সেই সাহাবিকে বললেন, ‘হে কৃষ্ণাঙ্গের সন্তান!’ আবু জর (রা.) কথাটি বললেন স্বভাব ও সমাজের স্বাভাবিক বোধ থেকে। আবু জর (রা.) কথাটি উচ্চারণ করলেন সমকালীন বাস্তবতার নির্দোষ উপলব্ধি থেকে। মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া তার এই অভিব্যক্তিতে কোনো খুঁত থাকতে পারে, কথাটিতে কোনো অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য থাকতে পারে, ভাবেননি আবু জর (রা.)। কারণ, এমন তো হরহামেশাই হচ্ছে। যাদের গায়ের রং কালো, ঘোর কালো, তাদের লোকে সামান্য খোঁচা দিয়েই ‘কালোর কালোত্ব’ মনে করে দেয়। কালোরা সেটাই হজম করে নেয়। আবু জর (রা.) তাই করেছেন, এর চেয়ে বেশি তো কিছু নয়।

কিন্তু ভোরের শান্ত আকাশ হঠাৎ করেই মেঘে মেঘে ছেয়ে যাওয়ার মতোই রাসুলুল্লাহর (সা.) উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল। অসহ্য কষ্টের ছাপ, অসঙ্গত ও অনুচিত কিছু একটা ঘটে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া সেই চেহারার মোবারক আদল দখল করে নিল। তিনি নারাজ হলেন। প্রচলিত সভ্যতা আর জাহিলি সংস্কৃতির ধরাছোঁয়ার বহু ঊর্ধ্বে মানবিকতার এক অমলিন ফরাশে যার অবস্হান, সেই রাসুলে আকরাম (সা.) আবু জরের এ একটি উক্তিতে বেদনাহত হলেন। নীরব অসন্তুষ্টির ক্ষুদ্র সরোবরে ডুব দিয়েও থাকলেন না তিনি। লক্ষ্যভেদী আশ্চর্য মায়াবী দুটি চোখ তিনি আবু জরের দিকে মেলে ধরলেন। এরপর শান্ত সমুদ্রের মতো গম্ভীর স্বরে তিনি কথা বললেন, ‘পাত্র ভরে দাও! সবাইকে সমান দাও! কাউকে খাটো করো না।’ তার কথা স্পষ্ট নির্দেশ হয়ে, অলংঘনীয় ফরমান হয়ে শুন্যে আন্দোলিত হলো।

তিনি আরো বললেন, ‘কোনো কৃষ্ণাঙ্গের সন্তানের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো সন্তানের কোনোই শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’

ছোট্ট একটি ফরমান। অনভ্যস্ত পরিবেশে এ ফরমান এক কঠোর চাবুকের মতো দুলে উঠল। সেই কথার চাবুক দুলতে দুলতে গিয়ে লাগল আবু জরের গায়, মাথায়, বিবেক ও বোধে। আবু জরের চিন্তা-চেতনার রুদ্ধ দুয়ারগুলো মুহুর্তেই খুলে গেল। রাশি রাশি আলোর বিন্দু এসে ঢুকল মগজের দীর্ঘ অন্ধকারে। আলোয় আলোয় দিশেহারা হয়ে গেলেন আবু জর; সত্যকণ্ঠ আবু জর (রা.)।

রাসুলুল্লাহর (সা.) মুখনিঃসৃত বাক্যটি শুন্যে এসে আন্দোলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবু জর (রা.) কেঁপে উঠলেন লজ্জায়, ভয়ে। কেঁপে উঠল তার অন্তরাত্মা। এরপর ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি; যখন তার আত্মা ঊর্ধ্বলোকের এক অপার্থিব, অসামান্য নুরের সন্ধান পেল, তার শরীর তখন ধুলোয় এসে নিল আশ্রয়। তারপর সমানে মাটিতে গড়াতে লাগলেন তিনি। লজ্জায়, অনুশোচনায়, অনুতাপে আর কষ্টে তার হৃদয় হাহাকার করে উঠল। তার কান্নাভেজা কণ্ঠ থেকে অনুনয় ঝরে পড়ল। কালো বর্ণের সেই সাহাবিকেই বিনয়ের সুরে, আব্দারের সুরে তিনি এবার বললেন, ‘ভাই! তুমি দাঁড়িয়ে যাও এবং দাঁড়িয়ে আমার মুখে পদাঘাত করো। এ কী বের হলো আমার মুখ থেকে।’

সত্যপন্হী, সত্যকণ্ঠ আবু জর (রা.) বিনয়, বিগলন, অন্তঃক্রন্দনে বিলীন হয়ে যেতে লাগলেন। বর্ণ-বিভাজনের যে প্রাচীর দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ধোঁয়াচ্ছন্ন মগজে, পরিচ্ছন্ন বিবেকের আঘাতে আঘাতে তাকে গুঁড়িয়ে দিলেন, মিশিয়ে দিলেন মাটির সঙ্গে।


**************************
শরীফ মুহাম্মদ
আমার দেশ, ১২ এপ্রিল ২০০৮

সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রাঃ)..................

খলিফা চতুষ্টয়ের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) কে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে। আমার এ ভাল লাগা স্বপ্রণোদিত অনেকটা অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটবেলা প্রথম যখন চার খলিফার নাম শুনি তখন থেকেই কেন জানি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি আমার একটা প্রগাঢ় ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠে এবং গড়ে উঠে মহান ব্যক্তিত্বের একটা ইমেজ।


তারপর স্কুল কলেজ পাঠ তালিকাভুক্ত চার খলিফা সম্বন্ধে পাস করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই পাঠ করেছি। পরবর্তী সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে রচিত তার উপর প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়েছি। এতে করে কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সম্বন্ধে আমার পূর্বেকার ধারণার বিন্দুমাত্র পরির্তন হয়নি। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই। হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্বন্ধে আমার যুক্তি ও প্রজ্ঞা বিবর্জিত ধারণার পেছনে আদৌ কোন সত্য নিহিত আছে কিনা তা জানার কৌতূহলই তার বিষয়ে কিছু জানার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছে। এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এই সীমিত জ্ঞান নিয়ে আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্বন্ধে যতটুকু জেনেছি তাতে আমাদের ইসলাম প্রচার ও প্রসারে তার মহান আত্মত্যাগ, সপ্রতিভ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা, উদার দৃষ্টিভঙ্গী এবং সর্বোপরি তার উৎকর্ষ চরিত্রের মাধুর্যে অভিভূত না হয়ে পারিনি।

হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বাল্য জীবন সম্বন্ধে খুব বেশী কিছু একটা জানা যায় না। তবে, তিনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং সমাজে বিশেষ পদ মর্যাদায় আসীন এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সামান্য লেখাপড়া জানতেন বলে অনুমান করা হয়। গৌড়বর্ণ, পাতলা ছিপছিপে গড়ন, সামান্য অপ্রশস্ত মুখমন্ডল, ঢিলেঢালে পোশাক, উচ্চ ললাট, অকাল পরিপক্ক কেশ এবং মেহেদী রঞ্জিত স্মশ্রু প্রভৃতি মিলিয়ে তার সমগ্র অবয়বে একজন খাঁটি ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। তিনি ছিলেন একজন অভিজাত সফল ব্যবসায়ী।

আঠার বৎসর বয়সে তিনি বস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। এতদ্ব্যতীত তার বহু সংখ্যক ছাগ, মেষ, মহিষ এবং উষ্ট্র ছিল। ব্যবসা ব্যাপদেশে তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেন। ব্যবসায়ে তার প্রচুর অর্থাগম হত। ব্যবসায়ে উপার্জিত অর্থ তিনি দীন-দুঃখীদের অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বিয়ে চারটি। দুইটি মক্কায় দুটি মদীনায়। হযরত বিবি আয়েশা দ্বিতীয়া স্ত্রী উস্মে রোমানার ঔরসজাত।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের মুহূর্তে থেকেই আমরা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ পাই। আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা, নিঃস্বর্থপরতা ও ন্যায়পরায়ণতা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার জন্য হযরত আবু বকর (রাঃ) ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্ম প্রচারে ক্ষিপ্ত হয়ে বিরোধী কোরায়েশগণ সর্বজনমান্য হযরত আবু বকরের নিকট অভিযোগ করল যে, এর একটা বিহিত করা দরকার। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন সরাসরি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ধর্মমত কি এবং কিইবা এর তত্ত্বকথা?

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) জানান যে, এক আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ (সাঃ) তার প্রেরিত পুরুষ। আল্লাহই একমাত্র সত্য ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী, অন্যসব অলীক মিথ্যে। হযরত আবু বকর (রাঃ) এই মহান সত্যে দীক্ষিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন এবং এরপর থেকে আমরা হযরত আবু বকরকে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর নিত্য সহচররূপে দেখতে পাই। রাসুল (সাঃ)-এর সব সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তিনি রাসুল (সাঃ)-এর জীবনকে সযত্নে আগলিয়ে রেখেছেন। সাহচর্য যখন ঘনিষ্ঠরূপ লাভ করে তখন তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়। বন্ধুত্ব প্রগাঢ়তা লাভ করে। সৃস্ট করে প্রেম বা প্রীতি। প্রেম যখন প্রেমিকের হ্নদয়ে স্থায়ীভাবে আসন গড়ে, তখন স্থাপিত হয় অন্তরঙ্গতা। আল্লাহর সাথে রাসুল (সাঃ)-এর সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরঙ্গতার বা স্থায়ী বন্ধুত্বের। আর রাসুল (সাঃ)-এর সাথে হযরত আবু বকরের সম্পকে হচ্ছে প্রীতি বা প্রেমের। নবী করিম (সাঃ) বলেন, আমি যদি অন্তরঙ্গ বন্ধু গ্রহণ করতাম তবে হযরত আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু, তোমাদের সঙ্গী আল্লাহর অন্তরঙ্গ হাবিব বা বন্ধু। রাসুল (সাঃ) যদি হন আল্লাহর প্রতিভূ, তবে হযরত আবু বকর হন রাসুল (সাঃ) এর প্রতিভূ। হযরত আবু বকর নিজেই বলেনঃ আল্লাহর নয়, আমি রাসুল (সাঃ)-এর প্রতিনিধি। হযরত আবু বকরের রাসুল প্রীতির মাত্র দুটো ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিরোধী কোরায়েশদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছুলে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) হিজরত (দেশ ত্যাগ) করার আদেশ প্রাপ্ত হন। তিনি বিষয়টি হযরত আবু বকরকে অবহিত করেন। হযরত আবু বকর এ হিজরতে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সময় ও সুযেগে বুঝে এক রাতে তারা উভয়ে দেশ ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে সত্তর নামক গহীন পর্বত গুহায় তারা আশ্রয় নেন। এ গুহায় অপ্রশস্ত মুখের বাধা দূর করে হযরত আবু বকর প্রথমে এতে প্রবেশ করেন এবং নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে নির্বিঘ্নে ও নির্ঝাঞ্ঝ্বাটে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পথে সুগম করে দেন। শত্রম্নপক্ষ যখন তাদের অনুসন্ধানে গুহার আশেপাশে তল্লাশি শুরু করে তখন ধরা পড়ার ভয়ে হযরত আবু বকর শংকিত, ভীত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-তাকে এ বলে প্রবোধ দেন ভীত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা , যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তার সাথীকে বলেছিল, বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহতো আমাদের সাথে আছেন।’ ৯ঃ৪০ লক্ষণীয় ব্যাপার যে, পরোক্ষভাবে হযরত আবু বকরের প্রসঙ্গ পবিত্র কোরআনে এভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। গুহায় বিদ্যমান গর্তগুলো বন্ধ করা গেলেও একটি গর্ত অরক্ষিত থেকে যায়। হযরত আবু বকর (রাঃ) সেই গর্তটিকে স্বীয় পদদ্বয় দ্বারা আটকিয়ে রাখেন। ঘটনাক্রমে, সেই গর্তে ছিল একটি সাপ, সেই সাপটি বের হওয়ার আশায় হযরত আবু বকরের পা দংশন করে যাচ্ছিল। তার জানুর উপর নিদ্রিত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাছে না ঘুমের ব্যঘাত ঘটে এ ভেবে তিনি পা সরাচ্ছিলেন না। যন্ত্রণা কাতর হযরত আবু বকরের অশ্রু রাসুল (সাঃ)-এর উপর পড়তেই তিনি জেগে উঠেন এবং সমস্ত বিষয় অবগত হন। [সূত্রঃ সারেদুল সুরসালীনঃ ১ম খন্ড পৃঃ ৩৯০] মাওলানা আবদুল মালেক। আত্মত্যাগের এমন মহৎ দৃষ্টান্ত সত্যি আমাদের মুগ্ধ করে।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন তার মেরাজের (আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বাকাশে নৈশ ভ্রমণ) অলৌকিক ঘটনা সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করছিলেন তখন তাদের অনেকেই এর সত্যতা সম্বন্ধে সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তারা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শরণাপন্ন হন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট যখন বিষয়ের বিবরণ প্রকাশ করা হয়, তখন তিনি এর প্রতিটি ঘটনাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং নির্দ্বিধায় মনে-প্রাণে সবকিছু বিশ্বাস করে নেন। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটেই তিনি ‘সিদ্দীক’ বা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত হন। [সূত্রঃ সাইয়েদুল মুরসালীন ১ম খন্ড, পৃঃ ৩০২ আবদুল খালেক।]

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর দেখা দেয় খলিফা নির্বাচনের সমস্যা। ইসলামের এই সংকটময় মুহূর্তে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ওফাতকে যখন সাহাবীগণ এমনকি হযরত উমর পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি, তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-তাদেরকে এই বলে শান্ত করতে পেরেছিলেন যে, ‘তোমরা যারা রাসুলের ইবাদত কর তারা জেনে রাখ যে তার মৃত্যু হয়েছে। আর যারা আল্লাহর ইবাদত কর তারা জেনে রেখ যে তিনি চিরজীবী। তোমরা কোরআনের সেই আয়াত স্মরণ কর আর মোহাম্মদ একজন রসুল বৈ তো নয়। তার পূর্বে বহু রসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে।------ ৩-১৪৪।

রাসুল (সাঃ)-এর দাফন-কাফন কার্য সমাধা হওয়ার পূর্বেই যখন খলিফা নির্বাচন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে দেখতে পাই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দৃঢ়চেতা জ্ঞানে বুৎপত্তিশীল একজন ব্যক্তি হিসেবে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ঘোষণা দেন যে, আমার একপাশে রয়েছেন হযরত উমর অন্য পাশে আছেন হযরত আবু উবায়দা আপনারা যাকে খুশি নির্বাচন করে নিন। বলাবাহুল্য তারা উভয়েই হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে তাকেই খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন।

ইসলাম ধর্মের সম্প্রচার ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে খালিদ বিন ওয়ালিদের অবদান অনস্বীকার্য। তার অপূর্ব বীরত্ব ও রণকৌশল এবং বুদ্ধিমত্তায় ইসলামকে একযুগ এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, মালিকের বিধবা পত্নী বন্দী লায়লার সাথে তার বিয়েকে কেন্দ্র করে অনেক অভিযোগ ওঠে। হযরত উমর (রাঃ) এই অভিযোগের বশবর্তী হয়েই তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার জন্য হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন। হযরত উমর (রাঃ) একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। হযরত আবু বকর (রাঃ) খালিদের জন্য বিচলিত হলেন। পরে লায়লার স্বামী মালিক হত্যার কারণে এবং লায়লার সাথে তার বিবাহ সম্পর্ক বিষয় নিয়ে তিনি খালিদকে কৈফিয়ত তলব করেন। বলাবাহুল্য, খালিদের বক্তব্য এতই যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো ছিল যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন এবং প্রধান সেনাপতির পদে বহাল রাখেন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে।

হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন নিঃস্বার্থপরতার আদর্শ প্রতীক। তার সমস্ত অর্থ ধন সম্পদ সবই দীন দুঃখী বন্দী ও ক্রীতদাস-দাসীদের মুক্তির জন্য অকাতরে দান করে গেছেন। দানশীলতায় একবার রাসুল করীম (সাঃ) হযরত উমরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন-উহারই ন্যায় অর্ধেক। হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসুলকে। নবী করীম (রাঃ) বললেনঃ আপনাদের পদমর্যাদা আপনাদের উত্তরের ভেতরই নিহিত।

চার খলিফার মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুই স্বাভাবিক ছিল। ঠাণ্ডা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য বোধগম্য নয় তবে মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) কামনা করেছিলেন রাসুল (সাঃ)-এর মৃত্যু দিবসে তার যেন মৃত্যু হয়। হিজরী ১৩ সনের জমাদিউলসানী মাসে ২২ তারিখ, সোমবার তিনি তার কামনাকেই চরিতার্থ করে গেছেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাশেই তাকে কবরস্থ করা হয়।

আপনাদের সকলের আনুগত্য প্রকাশের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) উঠে দাঁড়ান। এ সময় সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি যে ভাষণ প্রদান করেন তা স্বচ্ছতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহর প্রশংসার পরে তিনি বলেনঃ

ভাইসব, তোমরা আমাকে তোমাদের আমীর বা নেতা নির্বাচন করেছ। কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি ভাল করলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে। মন্দ কাজ করলে আমাকে বারণ করবে। সত্য হচ্ছে আমানত মিথ্যা হচ্ছে খেয়ানত। তোমাদের দুর্বল লোকটি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না তার ন্যায্য প্রাপ্য আমি তাকে প্রদান করতে পারি। তোমাদের নিকট শক্তিশালী লোকটি আমার নিকট দুর্বল, যতক্ষণ না তার নিকট থেকে প্রাপ্য আদায় করতে পxির। যে জাতি আল্লাহর পক্ষে জিহাদ বন্ধ করে দেয়, আল্লাহ তার ওপর অপমান চাপিয়ে দেন। যে জাতির মধ্যে নির্লজ্জতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তার উপর বিপদ-আপদ ও শাস্তি ব্যাপক করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের অনুগত থাকব, তোমরা আমার প্রতি অনুগত থাকবে। আল্লাহ এবং তার রাসুলের অবাধ্যতামূলক কোন কাজ যদি আমার দ্বারা হয়, আমার অনুগত থাকা তোমাদের উপর বাধ্যতামূলক নয়। এখন নামাজের জন্য দাঁড়াও। আল্লাহ তোমাদের প্রাপ্তি অনুগ্রহ করুন।

**************************
প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪ জানুয়ারী ২০০৮

সত্য সন্ধানী হযরত সালমান ফারসী (রা•).।.................

সত্য সন্ধানের জন্য যে ক’জন মনীষী পৃথিবীতে অমর এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিয়ে আজো মানুষের অন্তরকে আন্দোলিত করেন, চিন্তাশক্তিকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যান, তাদের মধ্যে অন্যতম হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) । পনের বছর বয়স থেকে শুরু হয় তার সত্য ধর্ম অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। তখন তার নাম ছিল মাহবা। পারস্যের অন্তর্গত ইস্পাহান এলাকাভুক্ত রামহরমুজ অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন সেখানকার বড় জমিদার।
তিনি ছিলেন অগ্নিপূজারী এবং খুবই ধর্মভীরু। একজন পদস্থ এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনদিন ধর্মের একটি সাধারণ কাজেও অবহেলা করতেন না। তার ধর্মানুরাগের জন্যও লোকে তাকে শ্রদ্ধা করতো।
বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় মাহবাকে তার স্থলাভিষিক্ত করার সব শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন। ছেলেকে কখনো কাছছাড়া করতেন না। একদিন বিশেষ কারণবশতঃ মাহবাকে তার বাবা খামার দেখবার জন্য পাঠালেন। পথিমধ্যে তিনি খ্রীষ্টানদের একটি উপাসনালয় থেকে কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে সেখানে ঢুকে দেখলেন তারা নামাজ পড়ছে। এর আগে তিনি কখনো বাইরে আসবার এবং লোকদের দেখবার সুযোগ পাননি। তাদের নামাজ পড়া, বিনম্র ব্যবহার, রীতি-নীতি এবং প্রাণখোলা ব্যবহার তার খুবই ভাল লাগলো। তিনি বাবার আদেশ ভুলে সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করলেন এবং ভাবলেন, তাদের ইবাদতখানায় অন্য মযহাবের লোক প্রবেশ করলে ইবাদতখানা অপবিত্র হয়ে যাবে এবং অগ্নি দেবতার অভিশাপে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে সব মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। এই নীতিই তো মহান ও শ্রেষ্ঠ। যদি কেউ ধর্ম চর্চা করে পরকালের শান্তির আশা করে, তবে এই ধর্মই শান্তির ধর্ম।
তিনি খ্রীস্টানদের ধর্মমত গ্রহণ করতে চাইলে পাদ্রী বললেন, তাকে জেরুজালেম যেতে হবে। কেননা এখানকার রাজ আদেশ মতে কোন অগ্নি উপাসককে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা বেআইনী এবং দণ্ডনীয়। এই আদেশ অমান্যকারীকে এখানে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়ে থাকে। মাহবা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে এলে বাবা বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মিথ্যে বলার অভ্যাস তার ছিল না। তাই তিনি বাবাকে সব খুলে বললেন। বাবা প্রথমে বোঝালেন। পরে পায়ে শিকল দিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখলেন। বাবার এই কঠোর ব্যবস্থায় মাহবার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠল। প্রতীজ্ঞা করলেন যে, সত্য সন্ধানে যদি এমন বাধাই আসে তবে তিনি বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন সব ত্যাগ করবেন।
বন্ধুদের মাধ্যমে মাহবা পাদ্রীর কাছে সংবাদ পাঠালেন যে, সিরিয়ার কোন যাত্রী কাফেলার খোঁজ পেলে তাকে যেন জানানো হয়। পাদ্রী শিকলকাটা যন্ত্র বন্ধুদের মাধ্যমে মাহবার কাছে পাঠিয়ে দিলেন এবং সিরিয়া যাবার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। যেদিন কাফেলা সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হবে সেদিন তিনি পায়ের শিকল কেটে কাফেলার সাথে মিলিত হলেন এবং সিরিয়ায় পৌঁছে গেলেন।
সিরিয়ার প্রধান পাদ্রীর কাছে তাদের ধর্ম গ্রহণ এবং তার খেদমতে থেকে ধর্ম শিক্ষার আগ্রহ জানালেন। সে মাহবাকে তার কাছে রেখে দিল। পাদ্রীটি ছিল জঘন্য প্রকৃতির। লোকদের দান-খয়রাতের ওয়াজ শোনাতো। লোকেরা তার কাছে দান-খয়রাত এনে দিলে সে তা গরীব মিসকীনকে না দিয়ে নিজেই সব আত্মসাৎ করতো। সে সাত মটকী সোনা-রূপা লুকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলে মাহবা উপস্থিত ভক্তদের তার অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং লুকিয়ে রাখা সোনা-রূপা দেখিয়ে দিলেন। এ দুষ্কার্যের জন্য লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তার লাশ শূলি কাঠে ঝুলিয়ে পাথরের আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন করল।
নতুন পাদ্রী নিয়োগ দেয়া হল। তিনি ছিলেন খুব ভাল লোক; দুনিয়ার লিপ্সাহীন এবং আখেরাতের প্রতি আকৃষ্ট। তার সাথে মাহবার সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। তার মৃত্যুর সময় মাহবা জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাকে কি আদেশ করেন এবং তিনি এখন কার আশ্রয়ে থাকবেন। পাদ্রী বললেন, ‘বর্তমানে খাঁটি ধর্ম কোথাও নেই, সকলেই বিকৃত করে ফেলেছে। ইরাকের ‘মোসেল’ এলাকায় একজন খাঁটি খ্রীষ্ট ধর্মীয় পাদ্রী আছেন, তুমি তার কাছে চলে যাও।’
মাহবা বর্ণিত সেই পাদ্রী জিরোমের কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন এবং তার কাছে রয়ে গেলেন। জিরোম একজন সত্যিকার আবেদ এবং জাহেদ ছিলেন। কিন্তু তিনি ইল্‌ম সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন। দামেশকে থাকাকালে মাহবা তাওরাত, ইঞ্জিল প্রভৃতি আসমানী কিতাব পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া ঈসায়ী সাহিত্যে মাহবা বেশ বুৎপত্তি লাভ করেন। কোন সাধারণ রাহেব তার বাছাইয়ের কষ্টিপাথরে টিকে থাকতে পারতো না। একমাত্র এই একটি কারণেই জিরোমের কাছে তার শান্তি মিলছিল না। শুধু ভাবতে লাগলেন কে তাকে বলে দেবে তার মঞ্জিল কোথায়।
একদিন সায়মানা নামে এক ব্যক্তির সাথে তার দেখা হয়। তিনি মানভী শাখার এক পাদ্রী। তিনি মাহবার কাছে তার মযহাব সম্বন্ধে বক্তৃতা করলেন। তিনি আন্তরিকতার সাথে তার মযহাবের আদর্শসমূহ শিক্ষা করতে শুরু করলেন। কেননা তার কাছেই ছিল সত্যের অনুসন্ধান করা। এ সময় জিরোম মারা গেলেন। তার মৃত্যুর আগে মাহবা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার পরে আমি কার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করব?’
তিনি মাহবাকে ইরাকেরই ‘নসীবীন’ এলাকার এক পাদ্রীর খোঁজ দিলেন। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই পাদ্রীর কাছে থাকলেন। তার মৃত্যুকালে মাহবাকে তিনি ‘আমুরিয়া’ নামক স্থানের এক পাদ্রীর খোঁজ দিলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে মাহবা সেই পাদ্রীর কাছে থাকলেন। এখানে তিনি সঞ্চয়ের দ্বারা কিছু পশুপাল সংগ্রহ করেন। পাদ্রীর মৃত্যুর সময় কারো খোঁজ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘বর্তমানে আমার কাছে খাঁটি একটি প্রাণীরও খোঁজ নেই, যার কাছে আশ্রয় নেবার পরামর্শ তোমাকে দেব। অবশ্য এক নতুন নবীর আবির্ভাবকাল ঘনিয়ে আসছে, যিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর খাঁটি একেশ্বরবাদী আদর্শ নিয়ে আসবেন। আরবে জন্মগ্রহণ করবেন এবং উভয় পাশে কাঁকরময় জমি আর মধ্যস্থলে খেজুর বাগানের আধিক্য-এমন এক এলাকায় হিজরত করে সেখানে বসবাস করবেন। সে নবীর নিদর্শন এমন হবে যে, তিনি হাদিয়া বা উপঢৌকনস্বরূপ খাদ্য দিলে তা খাবেন কিন্তু সদকা- খয়রাতের ব‘ খাবেন না এবং তার কাঁধে ‘মোহরে নবুয়ত’ থাকবে। যদি তোমার সাধ্যে কুলায় তবে তুমি সে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।
পাদ্রীর মৃত্যুর পর মাহবা কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। এখানে আরবের একদল বণিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা যদি আমাকে তোমাদের দেশে নিয়ে যাও তবে আমার পশুপাল তোমাদের দিয়ে দেব। এতে তারা রাজি হলো এবং মাহবাকে সঙ্গে নিয়ে আসল। কিন্তু তারা ‘ওয়াদিল ক্কোবা’ নামক স্থানে পৌঁছে অন্যায়ভাবে তাকে ক্রীতদাসরূপে এক ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। এরপর তিনি একজন থেকে অপরজনের কাছে বিক্রি হতে থাকলেন। এমনিভাবে তিনি তের বা ততোধিক মনিবের হাত বদল হন।
শেষে মদীনাবাসী এক ইহুদী মাহবাকে ক্রয় করলে তিনি মদীনায় পৌঁছেন। এলাকা দেখে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এটাই ঐ স্থান যার কথা পাদ্রী বলেছিলেন। তখনো হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মক্কা হতে মদীনায় আসেননি। মাহবা অতি যত্নের সাথে তার প্রতীক্ষায় ব্যাকুল থাকতেন। একদিন সে তার মনিবের উপস্থিতিতে খেজুর গাছের উপরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ এক লোক এসে তার মনিবকে সংবাদ দিল যে, ক্কোবা মহল্লায় মক্কা হতে একজন লোক এসেছে। সে নিজেকে নবী বলে দাবি করে। মাহবা গাছের ওপর থেকে কথাগুলো শুনতে পান। তার শরীর শিউরে ওঠে। উত্তেজনায় গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। কোন প্রকারে গাছ থেকে নেমে মনিবকে সংবাদটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে মাহবাকে ঘুষি মেরে বলল, তুই কাজে থাক। এ সংবাদে তোর দরকার কি? মাহবা বিকালে ক্কোবা মহল্লায় উপস্থিত হয়ে কিছু খাদ্যবস্তু হযরতের সামনে পেশ করলেন। হযরত (সাঃ) সে খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন যে, এগুলো সদকা বা দান। এ কথা শুনে হযরত (সাঃ) তা সঙ্গীদের দিয়ে দিলেন, নিজে খেলেন না। আর একদিন মাহবা কিছু খাবার নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আপনি সদকা-খয়রাত গ্রহণ করেন না দেখে আজ আমি এগুলো আপনার হাদিয়াস্বরূপ পেশ করছি। হযরত (সাঃ) সঙ্গীগণসহ তা খেলেন।
মাহবা ভাবলেন, দু’টা নিদর্শন ঠিক হল। এরপর একদিন হযরত (সাঃ) বসেছিলেন। মাহবা তার পিছনে দাঁড়িয়ে পিঠ মোবারক দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন। নবীজী তার মনোভাব বুঝতে পেরে কাঁধের কাপড় সরিয়ে ফেললেন। মাহবা তার মোহরে নবুয়ত দেখলেন এবং শ্রদ্ধার সাথে চুম্বন করে কেঁদে ফেললেন। হযরত (সাঃ) তার সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহবা তার জীবনের সুদীর্ঘ কাহিনী শোনালেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন। মাহবার নাম রাখা হল সালমান। তিনি পারস্যের অধিবাসী বলে সাহাবীরা তাকে ‘সালমান ফারসী’ বলে ডাকেন। যে মহাসত্য সন্ধানে অশেষ দুঃখ, কষ্ট, ঘাত-প্রতিঘাত, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা তিনি সহ্য করেছেন, সত্য সন্ধানী অতৃপ্ত আত্মা শত বৎসরেও যার তৃপ্ত হয়নি সেই অতৃপ্ত আত্মা আজ তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। তখন শুধু হ্নদয় ছাপিয়ে একটি শব্দই সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে প্রভুত্ব করে যাচ্ছিল ‘পেয়েছি।’
ক্রীতদাসরূপে ইহুদীর কাছে আবদ্ধ থাকায় স্বাধীনভাবে হযরতের (সাঃ) সাহচর্য লাভ সম্ভব হচ্ছিল না। এমনকি বদর এবং ওহুদ যুদ্ধে তিনি শরিক হতে পারেননি। তাই হযরত (সাঃ) বললেন, আপনি বিনিময় আদায়ের শর্তে মুক্তি লাভের চুক্তি করে নিন।’ সে মতে তার মনিবের সাথে আলাপ করলে সে তার মুক্তির জন্য দুইটি শর্ত আরোপ করল -(১) তিন বা পাঁচশত খেজুর গাছের চারা সঞ্চয় করে তা রোপণ করতে হবে এবং ঐসব গাছে ফল না আসা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। (২) চল্লিশ ‘উকিয়া’ অর্থাৎ ৬ সেরের অধিক পরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করতে হবে। এই দুই শর্ত পূর্ণ করলে তিনি মুক্তি লাভ করবেন বলে চুক্তি সম্পাদিত হল।
হযরত (সাঃ) সাহাবিগণকে বললেন, খেজুরের চারা দিয়ে তোমরা সবাই সালমানকে সাহায্য কর। সে মতে কেউ পাঁচটা, কেউ দশটা করে খেজুরের চারা তাকে দিলেন। তিন মতান্তরে পাঁচশত খেজুর চারা জমা হলে হযরত (সাঃ) সালমানকে (রাঃ) গাছ রোপণ করার জন্য গর্ত তৈরি করতে বললেন। গর্ত তৈরি হলে হযরত (সাঃ) সেখানে এসে নিজ হাতে গাছগুলো রোপণ করলেন; শুধু একটি গাছ ওমর (রাঃ) রোপণ করলেন। আল্লাহর কুদরতে এক বৎসরেই এই ঐ গাছগুলোতে ফল ধরল। ওমর (রাঃ)-এর লাগানো গাছটিতে এক বৎসরে ফল না ধরায় হযরত (সাঃ) তা উঠিয়ে পুনঃরোপণ করলে ঐ বৎসর তাতে ফল এসে গেল। এভাবে প্রথম শর্ত পূরণ হল।
এদিকে ডিমের আকারে একটি স্বর্ণ চাকা হযরত (সাঃ)-এর হস্তগত হলে তিনি তা সালমানকে (রাঃ) দিয়ে বললেন, ‘এ দিয়ে আপনার মুক্তির শর্ত পূরণ করুন।’ সালমান (রাঃ) এতটুকু স্বর্ণে শর্ত পূরণ হবে না জানালে নবীজী বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা এর দ্বারাই সম্পূর্ণ আদায় করে দেবেন।’
বাস্তবিকই যখন শর্ত আদায়ের জন্য ওজন দেয়া হল তখন তা চল্লিশ উকিয়া পরিমাণ দেখা গেল। এমনিভাবে দুইটি শর্ত পূরণ হল এবং সালমান (রাঃ) আজাদ হয়ে গেলেন। সত্য সাধনার জয়লাভের নিশ্চয়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন সালমান ফারসী (রাঃ)।


**************************
র ও শ ন আ খ তা র
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৯ মে ২০০৮

হযরত আবু যর গিফারী (রা·)...............

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) ছিলেন রাসূল (সাঃ) এর একজন প্রিয় সাহাবী। তার পূর্ব পরিচিত ছিল এরূপঃ বাইরের জগতের সাথে মক্কার সংযুক্তি ঘটিয়েছে যে, আদ্দান উপত্যকাটি, সেখানেই ছিল গিফার গোত্রের বসতি। জুনদুব ইবনে জুনাদাহ আবু যর নামেই যিনি পরিচিত-তিনিও ছিলেন এ কবীলার সন্তান। বাল্যকাল থেকেই তিনি অসীম সাহস, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টির জন্য ছিলেন সকলের থেকে স্বতন্ত্র।
জাহেলী যুগে জীবনের প্রথম ভাগে তার পেশাও ছিল রাহাজানি। গিফার গোত্রের একজন দুঃসাহসী ডাকাত হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যে তার জীবনে ঘটে যায় এক পরিবর্তন। তার গোত্রীয় লোকেরা এক আল্লাহ ছাড়া সকল মূর্তির পূজা করত। তাতে তিনি গভীর ব্যথা অনুভব করতেন। কিছুদিন পরেই তিনি নিজেই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ। ইবনে হাজার ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়, তিনি তার গোত্রের সাথে বসবাস করছিলেন। একদিন সংবাদ পেলেন মক্কায় এক নতুন নবীর আবির্ভাব হয়েছে; তাই তিনি তার ভাই আনিসকে ডেকে বললেনঃ তুমি একটু মক্কায় যাবে। সেখানে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন এবং আসমান থেকে তার কাছে ওহী আসে বলে প্রচার করে থাকেন; তার সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করবে, তার মুখের কিছু কথা শুনবে। তারপর ফিরে এসে আমাকে অবহিত করবে। আনিস মক্কায় চলে গেলেন। রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখ নিঃসৃত বাণী শ্রবণ করে নিজ গোত্রে ফিরে এলেন। আবু যর (রাঃ) খবর পেয়ে তখনই ছুটে গেলেন আনিসের কাছে। অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে নতুন নবী সম্পর্কে নানান কথা তাকে জিজ্ঞেস করলেন। আনিস বললেনঃ কসম আল্লাহর। আমি তো লোকটি দেখলাম, মানুষকে তিনি মহৎ চরিত্রের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। আর এমন কথা বলেন যা কাব্য বলেও মনে হল না। মানুষ তার সম্পর্কে কি বলাবলি করে? কেউ বলে- তিনি একজন যাদুকর, কেউ বলে গণক, আবার কেউ বলে কবি। আল্লাহর কসম। তুমি আমার তৃষ্ণা মেটাতে পারলে না। আমার আকাঙক্ষাও পূরণ করতে সক্ষম হলে না। তুমি কি পারবে আমার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে, যাতে আমি মক্কায় গিয়ে স্বচক্ষেই তার অবস্থা দেখে আসতে পারি? তবে আপনি মক্কাবাসীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।
পরদিন সকালে আবুযর চললেন মক্কার উদ্দেশ্যে। সাথে নিলেন কিছু পাথেয় ও এক মশক পানি। সর্বদা তিনি শংকিত, ভীত চকিত। কোন ব্যক্তির কাছে মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে কোন কথা জিজ্ঞেস করা তিনি সমীচীন মনে করলেন না। কারণ, তার জানা নেই এ জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিটি মুহাম্মদের বন্ধু না শত্রম্ন? দিনটি কেটে গেল। রাতের আঁধার নেমে এল। তিনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। বিশ্রামের উদ্দেশ্যে তিনি শুয়ে পড়লেন মাসজিদুল হারামের এক কোণে। আলী ইবন আবী তালিব যাচ্ছিলেন সে পথ দিয়েই। দেখে তিনি বুঝতে পারলেন লোকটি মুসাফির। ডাকলেন, আসুন আমার বাড়িতে। আবুযর গেলেন তার সাথে এবং সেখানেই রাতটি কাটিয়ে দিলেন।
সকালবেলা পানির মশক ও খাবারের পুঁটলিটি হাতে নিয়ে আবার ফিরে এলেন মাসজিদে। তবে দু’জনের একজন ও একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। পরের দিনটিও কেটে গেল। কিন্তু নবীর সাথে পরিচয় হল না। আজো মাসজিদে শুয়ে পড়লেন। আজো আলী (রাঃ) আবার সে পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। বললেনঃ ব্যাপার কি, লোকটি আজো তার গন্তব্যস্থল চিনতে পারেনি? তিনি তাকেই আবার সাথে করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এ রাতটি সেখানে কেটে গেল। এদিনও কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। একইভাবে তৃতীয় রাতটি নেমে এল। আলী (রাঃ) আজ বললেন- বলুন তো আপনি কি উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন? তিনি বললেন, যদি আমার কাছে অঙ্গীকার করেন, আমার কাঙিক্ষত বিষয়ের দিকে আপনি আমাকে পথ দেখাবেন, তাহলে আমি বলতে পারি। আলী (রাঃ) অঙ্গীকার করলেন। আবু যর বললেনঃ আমি অনেক দূর থেকেই মক্কায় এসেছি নতুন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তিনি যেসব কথা বলেন, তার কিছু শুনতে। আলীর (রাঃ) মুখ-মণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, আল্লাহর কসম, তিনি নিশ্চিত সত্য নবী। একথা বলে তিনি নানাভাবে নবীর (সাঃ) পরিচয় দিলেন। তিনি আরো বললেন, সকালে আমি যেখানেই যাই, আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি আপনার জন্য আশংকাজনক কোনকিছু লক্ষ্য করি তাহলে প্রস্রাবের ভান করে দাঁড়িয়ে যাব। আবার যখন চলব, আমাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবেন। এভাবে আমি যেখানে প্রবেশ করি আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। প্রিয়নবী দর্শন লাভ ও তার ওপর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ শ্রবণ করার প্রবল আগ্রহ ও উৎকণ্ঠায় আবু যর সারাটা রাত বিছানায় স্থির হতে পারলেন না। পরদিন সকালে মেহমান সাথে করে আলী (রাঃ) চললেন রাসূল (সাঃ)-এর বাড়ির দিকে। আবু যর তার পেছনে পেছনে। পথের আশপাশের কোনকিছুর প্রতি তার ভ্রম্নক্ষেপ নেই। এভাবে তারা পৌঁছলেন রাসূল (সাঃ)-এর কাছে। আবু যর সালাম করলেন। আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন, ওয়া আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ। এভাবে আবু যর সর্বপ্রথম ইসলামী কায়দায় রাসূল (সাঃ)-কে সালাম পেশ করার গৌরব অর্জন করেন। অতঃপর সালাম বিনিময়ের এ পদ্ধতিই গৃহীত ও প্রচারিত হয়।
রাসূল (সাঃ) আবু যরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শোনালেন। সেখানে বসেই আবু যর কালেমায়ে তাওহীদের পাঠ করে নতুন দ্বীনের মধ্যে প্রবেশের ঘোষণা দিলেন এবং তার সাথে সাথেই তাওহীদের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য ওঠে-পড়ে লেগে গেলেন। আবু যর (রাঃ) বলেন-আমি মসজিদে এলাম। কুরাইশরা তখন একত্রে বসে গুজব করছে। আমি তাদের মাঝে হাযির হয়ে যতদূর সম্ভব উচ্চকণ্ঠে সম্বোধন করে বললাম, কুরাইশ গোত্রের লোকেরা আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল। এ কথা বলার সাথে সাথেই কুরাইশরা ভীত-চকিত হয়ে পড়ল এবং একযোগে সবাই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আমাকে বেদম প্রহার শুরু করল। রাসূলের চাচা- আব্বাস আমাকে চিনতে পেরে তাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করলেন। একটু সুস্থ হয়ে আমি রাসূল (সাঃ)-এর কাছে ফিরে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে তিনি বললেন, তোমাকে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলাম না? বললাম ইয়া রাসূলুল্লাহ! নিজের মধ্যে এক প্রবল ইচ্ছা অনুভব করছিলাম। সে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছি মাত্র।
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালীন আল-ইসাবা গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন লোকেরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে গমনের ব্যাপারে ইতস্ততঃ প্রকাশ করতে লাগল। কোন ব্যক্তিকে দেখা না গেলে সাহাবীরা বলতেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ অমুক আসেনি। জবাবে তিনি বলতেন, যদি তার উদ্দেশ্য মহৎ হয়, তাহলে শিগগিরই আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে মিলিত করবেন। এক সময় আবুযরের নামটি উল্লেখ করে বলা হল, সেও পিঠটান দিয়েছে।
প্রকৃত ঘটনা হল, তার উটের ছিল মন্থর গতি। প্রথমে তিনি উটটিকে দ্রুত চালাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে নিজের কাঁধে উঠিয়ে হাঁটা শুরু করেন এবং অগ্রবর্তী মানজিলে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এক সাহাবী দূর থেকে তাকে দেখে বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ রাস্তা দিয়ে কে একজন যেন আসছে। তিনি বললেনঃ আবু যরই হবে। লোকেরা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে চিনতে পারল এবং বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, এতো আবু যরই। তিনি বললেন, আল্লাহ আবু যরের ওপর রহমত করুন। সে একাকী চলে, একাকীই মরবে, কিয়ামতের দিন একাই উঠবে। (তারীখুল ইসলামঃ আল্লামা যাহাবী ৩য় খণ্ড)।
রাসূল (সাঃ)-এর দ্বিতীয় ভবিষ্যৎ বাণীটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। হযরত আবু যর ছিলেন প্রকৃতিগতভাবেই সরল, সাদাসিধে, দুনিয়াবিরাগী ও নির্জনতা প্রিয় স্বভাবের। এ কারণে রাসূল (সাঃ) তাঁর উপাধি দিয়েছিলেন- ‘মসিরুল ইসলাম।’ রাসূল (সাঃ)-এর ওফাতের পর তিনি দুনিয়ার সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন হয়ে পড়েন। প্রিয় নবীর বিচ্ছেদে তাঁর অন্তর অভ্যন্তরে যে দাহ শুরু হয়েছিল তা আর কখনো প্রশমিত হয়নি।
হযরত আবু যর (রাঃ) এর ওফাতের কাহিনীটিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। হিজরী ৩১ মতান্তরে ৩২ সনে তিনি রাবজার মরুভূমিতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর সহধর্মিনী তাঁর অন্তিমকালীন অবস্থার বর্ণনা করেছেন এভাবে- আবু যরের অবস্থা যখন খুবই খারাপ হয়ে পড়ল, আমি তখন কাঁদতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, কাঁদছ কেন? বললামঃ এক নির্জন মরুভূমিতে আপনি পরকালের দিকে যাত্রা করছেন। এখানে আমার ও আপনার ব্যবহ্নত বস্ত্র ছাড়া অতিরিক্ত এমন বস্ত্র নেই যা দ্বারা আপনার কাফন দেয়া যেতে পারে। তিনি বললেনঃ কান্না থামাও। তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে একজন মরুভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তার মরণের সময় মুসলিমদের একটি দল সেখানে অকস্মাৎ উপস্থিত হবে। আমি ছাড়া সে লোকগুলোর সকলেই লোকালয়ে ইন্তেকাল করেছে। এখন মাত্র আমিই বেঁচে আছি। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সে ব্যক্তি আমিই।
সেই কাফেলাটি হল ইয়ামেনী। তারা কুফা থেকে এসেছিল। আর তাদের সাথে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)। এ কাফিলার সাথে তিনি ইরাক যাচ্ছিলেন। তিনিই আবু যরের জানাযার ইমামতি করেন এবং সকলে মিলে তাকে রাবজার মরুভূমিতে দাফন করেন।

**************************
মা ও লা না শা হ মো হা ম্ম দ হা বি বু র র হ মা ন
দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ জুলাই, ২০০৮

ইসলামের নির্দেশনাঃ পিতা-মাতার প্রতি

পিতা-মাতার মতো এই পৃথিবীতে আপনজন আর কেউই নেই। পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পর পিতামাতাই সন্তানের কাছে অধিক শ্রদ্ধেয়। মহান স্রষ্টা আমাদের সৃষ্টি করেছেন সীমাহীন অনুগ্রহ ও দয়া দিয়ে। তাই আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা এবং তাঁর ইবাদত করা। এরপর যাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করা উচিত তারা হলেন পিতা-মাতা।
তাদের কারণেই আমরা এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পেরেছি। একথা অনস্বীকার্য, শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সন্তান যতই বৃদ্ধ হোক না কেন পিতা-মাতার কাছে সন্তান সর্বদা শিশুর মতো। আজন্ম সন্তান পিতা-মাতার কাছে স্নেহ, আদর আর দয়া-মায়াতেই লালিত-পালিত হয়। পিতা-মাতা কখনো সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন না। পিতা-মাতা শত দুঃখ-কষ্ট পেলেও সন্তানের জন্য সর্বদা শুভ কামনা করেন। দোয়া করেন।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা যতই আত্মিক হোক না কেন, জনক-জননী হিসেবে পিতা-মাতার অধিকার ও তাদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য পালনে যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পরবর্তী জীবনে এই দায়িত্বের কারণেই সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। জন্মগতভাবে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার যে অধিকার রয়েছে তা কিন্তু অনেকের কাছ থেকে আদায় করা যায় না। কেবল সন্তানই পিতা-মাতার প্রতি তার কর্তব্য পালন করে পিতা-মাতার অধিকারকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্বই মুলত মুখ্য বিষয়। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহপাক কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন-তোমরা তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত-বন্দেগি করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি চরম আদর ও সদ্ব্যবহার করবে। যদি তাদের একজন অথবা উভয়েই বার্ধক্যে উপনীত হন তবে মনে রেখ, তুমি তাদের প্রতি কোনোরুপ উহ্ শব্দটি বলার কারণ ঘটাবে না অর্থাৎ তাদের অন্তরে কোনো কষ্ট বা চোট লাগে এমন ব্যবহার করবে না। পিতা-মাতার সঙ্গে মিষ্টিমধুর সদালাপ কর। তাদের সামনে বড়ত্ব বা কেদদারি ভাব প্রদর্শন করবে না। তারা যেমনি অতি আদর-স্নেহে-যত্মে লালন-পালন করেছেন, তোমরা তাদের প্রতি তেমনিভাবে সদয় হও।
জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে পিতা-মাতার নির্দেশ মান্য করা সন্তানের কর্তব্য। কিন্তু পিতা-মাতা যদি ইসলামবিরোধী কাজ করতে নির্দেশ দেয় বা চাপ প্রয়োগ করে, সেক্ষেত্রে পিতামাতার আল্লাহদ্রোহী আদেশ অমান্য করার জন্য আল্লাহপাকের নির্দেশ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সন্তান পিতা-মাতাকে ত্যাগ করতে পারবে না বা তাদের সঙ্গে কোনোরুপ দুর্বøবহার করা যাবে না। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-‘ওয়া ইন জাহাদাকা আলা আনতুশরিক বি মা লাইসা লাকা বিহি ইলমুন ওয়া ছাহিবহুমা ফিদ্দুনিয়া মারুফান ওয়াত্তাবি সাবিলা মান আনাবা ইলাইয়্যা। অর্থাৎ যদি পিতা-মাতা তোমার ওপর চাপ প্রয়োগ করেন আমার সঙ্গে শরিক করার জন্য যা তোমার বোধগম্য নয়, তাহলে তাদের কথা মেনে নিও না। আর পার্থিব জীবনে উৎকৃষ্ট পন্হায় তাদের সঙ্গে সৎ সম্পর্ক বজায় রেখ। আর তুমি তাদের পথ অনুসরণ করো না।
একবার এক ব্যক্তি আমাদের প্রিয় নবী হজরত রাসুলে করিমের (সা.) খেদমতে এসে আরজ করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমার পিতা-মাতার ইন্তেকাল হয়েছে, তাদের জন্য আমার কি কি হক পালনীয়? হজরত রাসুলে পাক (সা.) বলেনঃ নামাজ আদায় করে গুনাহখাতা মাফির জন্য আল্লাহ রাহমানুর রাহিমের দরবারে ক্ষমা ফরিয়াদ করো এবং তাদের কোনোখানে কোনো ওয়াদা থাকলে তাও যথাযথ পালন করো।

আরেকবার কোনো এক ব্যক্তি হজরত রাসুলে মকবুলকে (সা.) প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমি কার সঙ্গে আদব রক্ষা করব, সদ্ব্যবহার করব। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাৎক্ষণিক বলে দিলেন, তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে। লোকটি আবার বলল, তারা তো ইন্তেকাল করেছেন। হুজুরে আকরাম (সা.) জবাবে বললেন, তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় লক্ষ্য করি কোনো কোনো সন্তান পিতা-মাতাকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও ঘৃণার চোখে দেখে এবং তাচ্ছিল্য করে। এটা আদৌ ন্যায়সঙ্গত নয়। যা ধর্ম ও সমাজের নীতিমালার ঘোর পরিপন্হী। সন্তানের কাছে পিতা-মাতার সম্মান বা কদর সম্পর্কে আমাদের মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন-জেনে রাখো, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। তিনি আরো বলেছেন, পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি। পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহপাকের অসন্তুষ্টি। অতএব, দুনিয়ার জীবনে এবং পরকালে বেহেশত পেতে হলে অবশ্য অবশ্যই পিতা-মাতার প্রতি সেবা-যত্ম, সম্মান-সেবা-যত্ম-সম্মান ও আনুগত্য থাকতে হবে। সর্বোপরি স্মরণ ও বরণ করে নিতে হবে-পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য অপরিসীম। আল্লাহপাক যেন আমাদের পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যথাযথ সচেষ্ট হওয়ার তওফিক দিন।

**************************
মা ও লা না শা হ আ ব দু স সা ত্তা র
আমার দেশ, ২৪ মে ২০০৮