Our social:

Latest Post

Showing posts with label সাহাবী. Show all posts
Showing posts with label সাহাবী. Show all posts

Saturday, 9 April 2011

অনন্য উপলব্ধি ...............

পুর্বাকাশে নরম সুর্যের মতো তাঁর অবস্হান। সবার মাঝে তিনি বসে আছেন। সাহাবিরা তাঁর আশপাশে, মুখোমুখি। আলোর চারপাশে আলোপিয়াসীদের তৃষ্ণার্ত উপবেশন। ভোরের স্নিগ্ধ সৌরভের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ পবিত্রতা মজমাকে ঘিরে রেখেছে। তিনি সবার দিকে চোখ ফেলছেন, কথা বলছেন, শুনছেন কারো কারো কথা! তাঁর খুব কাছাকাছি বসে আছেন এক সাহাবি; যার গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণ। অদুরে অন্য অনেকের মাঝে আছেন আবু জর (রা.)।


অকস্মাৎ আবু জর, কালো বর্ণের সেই সাহাবিকে বললেন, ‘হে কৃষ্ণাঙ্গের সন্তান!’ আবু জর (রা.) কথাটি বললেন স্বভাব ও সমাজের স্বাভাবিক বোধ থেকে। আবু জর (রা.) কথাটি উচ্চারণ করলেন সমকালীন বাস্তবতার নির্দোষ উপলব্ধি থেকে। মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া তার এই অভিব্যক্তিতে কোনো খুঁত থাকতে পারে, কথাটিতে কোনো অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য থাকতে পারে, ভাবেননি আবু জর (রা.)। কারণ, এমন তো হরহামেশাই হচ্ছে। যাদের গায়ের রং কালো, ঘোর কালো, তাদের লোকে সামান্য খোঁচা দিয়েই ‘কালোর কালোত্ব’ মনে করে দেয়। কালোরা সেটাই হজম করে নেয়। আবু জর (রা.) তাই করেছেন, এর চেয়ে বেশি তো কিছু নয়।

কিন্তু ভোরের শান্ত আকাশ হঠাৎ করেই মেঘে মেঘে ছেয়ে যাওয়ার মতোই রাসুলুল্লাহর (সা.) উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল। অসহ্য কষ্টের ছাপ, অসঙ্গত ও অনুচিত কিছু একটা ঘটে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া সেই চেহারার মোবারক আদল দখল করে নিল। তিনি নারাজ হলেন। প্রচলিত সভ্যতা আর জাহিলি সংস্কৃতির ধরাছোঁয়ার বহু ঊর্ধ্বে মানবিকতার এক অমলিন ফরাশে যার অবস্হান, সেই রাসুলে আকরাম (সা.) আবু জরের এ একটি উক্তিতে বেদনাহত হলেন। নীরব অসন্তুষ্টির ক্ষুদ্র সরোবরে ডুব দিয়েও থাকলেন না তিনি। লক্ষ্যভেদী আশ্চর্য মায়াবী দুটি চোখ তিনি আবু জরের দিকে মেলে ধরলেন। এরপর শান্ত সমুদ্রের মতো গম্ভীর স্বরে তিনি কথা বললেন, ‘পাত্র ভরে দাও! সবাইকে সমান দাও! কাউকে খাটো করো না।’ তার কথা স্পষ্ট নির্দেশ হয়ে, অলংঘনীয় ফরমান হয়ে শুন্যে আন্দোলিত হলো।

তিনি আরো বললেন, ‘কোনো কৃষ্ণাঙ্গের সন্তানের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো সন্তানের কোনোই শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’

ছোট্ট একটি ফরমান। অনভ্যস্ত পরিবেশে এ ফরমান এক কঠোর চাবুকের মতো দুলে উঠল। সেই কথার চাবুক দুলতে দুলতে গিয়ে লাগল আবু জরের গায়, মাথায়, বিবেক ও বোধে। আবু জরের চিন্তা-চেতনার রুদ্ধ দুয়ারগুলো মুহুর্তেই খুলে গেল। রাশি রাশি আলোর বিন্দু এসে ঢুকল মগজের দীর্ঘ অন্ধকারে। আলোয় আলোয় দিশেহারা হয়ে গেলেন আবু জর; সত্যকণ্ঠ আবু জর (রা.)।

রাসুলুল্লাহর (সা.) মুখনিঃসৃত বাক্যটি শুন্যে এসে আন্দোলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবু জর (রা.) কেঁপে উঠলেন লজ্জায়, ভয়ে। কেঁপে উঠল তার অন্তরাত্মা। এরপর ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি; যখন তার আত্মা ঊর্ধ্বলোকের এক অপার্থিব, অসামান্য নুরের সন্ধান পেল, তার শরীর তখন ধুলোয় এসে নিল আশ্রয়। তারপর সমানে মাটিতে গড়াতে লাগলেন তিনি। লজ্জায়, অনুশোচনায়, অনুতাপে আর কষ্টে তার হৃদয় হাহাকার করে উঠল। তার কান্নাভেজা কণ্ঠ থেকে অনুনয় ঝরে পড়ল। কালো বর্ণের সেই সাহাবিকেই বিনয়ের সুরে, আব্দারের সুরে তিনি এবার বললেন, ‘ভাই! তুমি দাঁড়িয়ে যাও এবং দাঁড়িয়ে আমার মুখে পদাঘাত করো। এ কী বের হলো আমার মুখ থেকে।’

সত্যপন্হী, সত্যকণ্ঠ আবু জর (রা.) বিনয়, বিগলন, অন্তঃক্রন্দনে বিলীন হয়ে যেতে লাগলেন। বর্ণ-বিভাজনের যে প্রাচীর দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ধোঁয়াচ্ছন্ন মগজে, পরিচ্ছন্ন বিবেকের আঘাতে আঘাতে তাকে গুঁড়িয়ে দিলেন, মিশিয়ে দিলেন মাটির সঙ্গে।


**************************
শরীফ মুহাম্মদ
আমার দেশ, ১২ এপ্রিল ২০০৮

সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রাঃ)..................

খলিফা চতুষ্টয়ের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) কে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে। আমার এ ভাল লাগা স্বপ্রণোদিত অনেকটা অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটবেলা প্রথম যখন চার খলিফার নাম শুনি তখন থেকেই কেন জানি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি আমার একটা প্রগাঢ় ভক্তি শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠে এবং গড়ে উঠে মহান ব্যক্তিত্বের একটা ইমেজ।


তারপর স্কুল কলেজ পাঠ তালিকাভুক্ত চার খলিফা সম্বন্ধে পাস করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই পাঠ করেছি। পরবর্তী সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে রচিত তার উপর প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়েছি। এতে করে কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) এর সম্বন্ধে আমার পূর্বেকার ধারণার বিন্দুমাত্র পরির্তন হয়নি। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই। হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্বন্ধে আমার যুক্তি ও প্রজ্ঞা বিবর্জিত ধারণার পেছনে আদৌ কোন সত্য নিহিত আছে কিনা তা জানার কৌতূহলই তার বিষয়ে কিছু জানার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছে। এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এই সীমিত জ্ঞান নিয়ে আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্বন্ধে যতটুকু জেনেছি তাতে আমাদের ইসলাম প্রচার ও প্রসারে তার মহান আত্মত্যাগ, সপ্রতিভ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা, উদার দৃষ্টিভঙ্গী এবং সর্বোপরি তার উৎকর্ষ চরিত্রের মাধুর্যে অভিভূত না হয়ে পারিনি।

হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বাল্য জীবন সম্বন্ধে খুব বেশী কিছু একটা জানা যায় না। তবে, তিনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং সমাজে বিশেষ পদ মর্যাদায় আসীন এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সামান্য লেখাপড়া জানতেন বলে অনুমান করা হয়। গৌড়বর্ণ, পাতলা ছিপছিপে গড়ন, সামান্য অপ্রশস্ত মুখমন্ডল, ঢিলেঢালে পোশাক, উচ্চ ললাট, অকাল পরিপক্ক কেশ এবং মেহেদী রঞ্জিত স্মশ্রু প্রভৃতি মিলিয়ে তার সমগ্র অবয়বে একজন খাঁটি ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। তিনি ছিলেন একজন অভিজাত সফল ব্যবসায়ী।

আঠার বৎসর বয়সে তিনি বস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। এতদ্ব্যতীত তার বহু সংখ্যক ছাগ, মেষ, মহিষ এবং উষ্ট্র ছিল। ব্যবসা ব্যাপদেশে তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেন। ব্যবসায়ে তার প্রচুর অর্থাগম হত। ব্যবসায়ে উপার্জিত অর্থ তিনি দীন-দুঃখীদের অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বিয়ে চারটি। দুইটি মক্কায় দুটি মদীনায়। হযরত বিবি আয়েশা দ্বিতীয়া স্ত্রী উস্মে রোমানার ঔরসজাত।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের মুহূর্তে থেকেই আমরা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ পাই। আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা, নিঃস্বর্থপরতা ও ন্যায়পরায়ণতা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার জন্য হযরত আবু বকর (রাঃ) ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্ম প্রচারে ক্ষিপ্ত হয়ে বিরোধী কোরায়েশগণ সর্বজনমান্য হযরত আবু বকরের নিকট অভিযোগ করল যে, এর একটা বিহিত করা দরকার। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন সরাসরি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ধর্মমত কি এবং কিইবা এর তত্ত্বকথা?

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) জানান যে, এক আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ (সাঃ) তার প্রেরিত পুরুষ। আল্লাহই একমাত্র সত্য ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী, অন্যসব অলীক মিথ্যে। হযরত আবু বকর (রাঃ) এই মহান সত্যে দীক্ষিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন এবং এরপর থেকে আমরা হযরত আবু বকরকে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর নিত্য সহচররূপে দেখতে পাই। রাসুল (সাঃ)-এর সব সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তিনি রাসুল (সাঃ)-এর জীবনকে সযত্নে আগলিয়ে রেখেছেন। সাহচর্য যখন ঘনিষ্ঠরূপ লাভ করে তখন তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়। বন্ধুত্ব প্রগাঢ়তা লাভ করে। সৃস্ট করে প্রেম বা প্রীতি। প্রেম যখন প্রেমিকের হ্নদয়ে স্থায়ীভাবে আসন গড়ে, তখন স্থাপিত হয় অন্তরঙ্গতা। আল্লাহর সাথে রাসুল (সাঃ)-এর সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরঙ্গতার বা স্থায়ী বন্ধুত্বের। আর রাসুল (সাঃ)-এর সাথে হযরত আবু বকরের সম্পকে হচ্ছে প্রীতি বা প্রেমের। নবী করিম (সাঃ) বলেন, আমি যদি অন্তরঙ্গ বন্ধু গ্রহণ করতাম তবে হযরত আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু, তোমাদের সঙ্গী আল্লাহর অন্তরঙ্গ হাবিব বা বন্ধু। রাসুল (সাঃ) যদি হন আল্লাহর প্রতিভূ, তবে হযরত আবু বকর হন রাসুল (সাঃ) এর প্রতিভূ। হযরত আবু বকর নিজেই বলেনঃ আল্লাহর নয়, আমি রাসুল (সাঃ)-এর প্রতিনিধি। হযরত আবু বকরের রাসুল প্রীতির মাত্র দুটো ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিরোধী কোরায়েশদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছুলে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) হিজরত (দেশ ত্যাগ) করার আদেশ প্রাপ্ত হন। তিনি বিষয়টি হযরত আবু বকরকে অবহিত করেন। হযরত আবু বকর এ হিজরতে মোহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সময় ও সুযেগে বুঝে এক রাতে তারা উভয়ে দেশ ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে সত্তর নামক গহীন পর্বত গুহায় তারা আশ্রয় নেন। এ গুহায় অপ্রশস্ত মুখের বাধা দূর করে হযরত আবু বকর প্রথমে এতে প্রবেশ করেন এবং নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-কে নির্বিঘ্নে ও নির্ঝাঞ্ঝ্বাটে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পথে সুগম করে দেন। শত্রম্নপক্ষ যখন তাদের অনুসন্ধানে গুহার আশেপাশে তল্লাশি শুরু করে তখন ধরা পড়ার ভয়ে হযরত আবু বকর শংকিত, ভীত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-তাকে এ বলে প্রবোধ দেন ভীত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা , যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেরগণ তাকে বহিষ্কার করেছিল এবং সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তার সাথীকে বলেছিল, বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহতো আমাদের সাথে আছেন।’ ৯ঃ৪০ লক্ষণীয় ব্যাপার যে, পরোক্ষভাবে হযরত আবু বকরের প্রসঙ্গ পবিত্র কোরআনে এভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। গুহায় বিদ্যমান গর্তগুলো বন্ধ করা গেলেও একটি গর্ত অরক্ষিত থেকে যায়। হযরত আবু বকর (রাঃ) সেই গর্তটিকে স্বীয় পদদ্বয় দ্বারা আটকিয়ে রাখেন। ঘটনাক্রমে, সেই গর্তে ছিল একটি সাপ, সেই সাপটি বের হওয়ার আশায় হযরত আবু বকরের পা দংশন করে যাচ্ছিল। তার জানুর উপর নিদ্রিত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাছে না ঘুমের ব্যঘাত ঘটে এ ভেবে তিনি পা সরাচ্ছিলেন না। যন্ত্রণা কাতর হযরত আবু বকরের অশ্রু রাসুল (সাঃ)-এর উপর পড়তেই তিনি জেগে উঠেন এবং সমস্ত বিষয় অবগত হন। [সূত্রঃ সারেদুল সুরসালীনঃ ১ম খন্ড পৃঃ ৩৯০] মাওলানা আবদুল মালেক। আত্মত্যাগের এমন মহৎ দৃষ্টান্ত সত্যি আমাদের মুগ্ধ করে।

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন তার মেরাজের (আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বাকাশে নৈশ ভ্রমণ) অলৌকিক ঘটনা সাহাবীদের নিকট বর্ণনা করছিলেন তখন তাদের অনেকেই এর সত্যতা সম্বন্ধে সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তারা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শরণাপন্ন হন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট যখন বিষয়ের বিবরণ প্রকাশ করা হয়, তখন তিনি এর প্রতিটি ঘটনাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং নির্দ্বিধায় মনে-প্রাণে সবকিছু বিশ্বাস করে নেন। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটেই তিনি ‘সিদ্দীক’ বা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত হন। [সূত্রঃ সাইয়েদুল মুরসালীন ১ম খন্ড, পৃঃ ৩০২ আবদুল খালেক।]

হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর দেখা দেয় খলিফা নির্বাচনের সমস্যা। ইসলামের এই সংকটময় মুহূর্তে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ওফাতকে যখন সাহাবীগণ এমনকি হযরত উমর পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি, তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-তাদেরকে এই বলে শান্ত করতে পেরেছিলেন যে, ‘তোমরা যারা রাসুলের ইবাদত কর তারা জেনে রাখ যে তার মৃত্যু হয়েছে। আর যারা আল্লাহর ইবাদত কর তারা জেনে রেখ যে তিনি চিরজীবী। তোমরা কোরআনের সেই আয়াত স্মরণ কর আর মোহাম্মদ একজন রসুল বৈ তো নয়। তার পূর্বে বহু রসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে।------ ৩-১৪৪।

রাসুল (সাঃ)-এর দাফন-কাফন কার্য সমাধা হওয়ার পূর্বেই যখন খলিফা নির্বাচন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে তখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে দেখতে পাই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দৃঢ়চেতা জ্ঞানে বুৎপত্তিশীল একজন ব্যক্তি হিসেবে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ঘোষণা দেন যে, আমার একপাশে রয়েছেন হযরত উমর অন্য পাশে আছেন হযরত আবু উবায়দা আপনারা যাকে খুশি নির্বাচন করে নিন। বলাবাহুল্য তারা উভয়েই হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করে তাকেই খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন।

ইসলাম ধর্মের সম্প্রচার ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে খালিদ বিন ওয়ালিদের অবদান অনস্বীকার্য। তার অপূর্ব বীরত্ব ও রণকৌশল এবং বুদ্ধিমত্তায় ইসলামকে একযুগ এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, মালিকের বিধবা পত্নী বন্দী লায়লার সাথে তার বিয়েকে কেন্দ্র করে অনেক অভিযোগ ওঠে। হযরত উমর (রাঃ) এই অভিযোগের বশবর্তী হয়েই তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার জন্য হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করেন। হযরত উমর (রাঃ) একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। হযরত আবু বকর (রাঃ) খালিদের জন্য বিচলিত হলেন। পরে লায়লার স্বামী মালিক হত্যার কারণে এবং লায়লার সাথে তার বিবাহ সম্পর্ক বিষয় নিয়ে তিনি খালিদকে কৈফিয়ত তলব করেন। বলাবাহুল্য, খালিদের বক্তব্য এতই যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো ছিল যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন এবং প্রধান সেনাপতির পদে বহাল রাখেন। হযরত আবু বকরের (রাঃ) বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে।

হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন নিঃস্বার্থপরতার আদর্শ প্রতীক। তার সমস্ত অর্থ ধন সম্পদ সবই দীন দুঃখী বন্দী ও ক্রীতদাস-দাসীদের মুক্তির জন্য অকাতরে দান করে গেছেন। দানশীলতায় একবার রাসুল করীম (সাঃ) হযরত উমরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন-উহারই ন্যায় অর্ধেক। হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ আপনি স্বীয় পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন? হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসুলকে। নবী করীম (রাঃ) বললেনঃ আপনাদের পদমর্যাদা আপনাদের উত্তরের ভেতরই নিহিত।

চার খলিফার মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুই স্বাভাবিক ছিল। ঠাণ্ডা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য বোধগম্য নয় তবে মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) কামনা করেছিলেন রাসুল (সাঃ)-এর মৃত্যু দিবসে তার যেন মৃত্যু হয়। হিজরী ১৩ সনের জমাদিউলসানী মাসে ২২ তারিখ, সোমবার তিনি তার কামনাকেই চরিতার্থ করে গেছেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাশেই তাকে কবরস্থ করা হয়।

আপনাদের সকলের আনুগত্য প্রকাশের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) উঠে দাঁড়ান। এ সময় সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি যে ভাষণ প্রদান করেন তা স্বচ্ছতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহর প্রশংসার পরে তিনি বলেনঃ

ভাইসব, তোমরা আমাকে তোমাদের আমীর বা নেতা নির্বাচন করেছ। কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি ভাল করলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে। মন্দ কাজ করলে আমাকে বারণ করবে। সত্য হচ্ছে আমানত মিথ্যা হচ্ছে খেয়ানত। তোমাদের দুর্বল লোকটি আমার নিকট শক্তিশালী, যতক্ষণ না তার ন্যায্য প্রাপ্য আমি তাকে প্রদান করতে পারি। তোমাদের নিকট শক্তিশালী লোকটি আমার নিকট দুর্বল, যতক্ষণ না তার নিকট থেকে প্রাপ্য আদায় করতে পxির। যে জাতি আল্লাহর পক্ষে জিহাদ বন্ধ করে দেয়, আল্লাহ তার ওপর অপমান চাপিয়ে দেন। যে জাতির মধ্যে নির্লজ্জতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তার উপর বিপদ-আপদ ও শাস্তি ব্যাপক করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের অনুগত থাকব, তোমরা আমার প্রতি অনুগত থাকবে। আল্লাহ এবং তার রাসুলের অবাধ্যতামূলক কোন কাজ যদি আমার দ্বারা হয়, আমার অনুগত থাকা তোমাদের উপর বাধ্যতামূলক নয়। এখন নামাজের জন্য দাঁড়াও। আল্লাহ তোমাদের প্রাপ্তি অনুগ্রহ করুন।

**************************
প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪ জানুয়ারী ২০০৮

সত্য সন্ধানী হযরত সালমান ফারসী (রা•).।.................

সত্য সন্ধানের জন্য যে ক’জন মনীষী পৃথিবীতে অমর এবং উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিয়ে আজো মানুষের অন্তরকে আন্দোলিত করেন, চিন্তাশক্তিকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যান, তাদের মধ্যে অন্যতম হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) । পনের বছর বয়স থেকে শুরু হয় তার সত্য ধর্ম অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। তখন তার নাম ছিল মাহবা। পারস্যের অন্তর্গত ইস্পাহান এলাকাভুক্ত রামহরমুজ অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন সেখানকার বড় জমিদার।
তিনি ছিলেন অগ্নিপূজারী এবং খুবই ধর্মভীরু। একজন পদস্থ এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনদিন ধর্মের একটি সাধারণ কাজেও অবহেলা করতেন না। তার ধর্মানুরাগের জন্যও লোকে তাকে শ্রদ্ধা করতো।
বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় মাহবাকে তার স্থলাভিষিক্ত করার সব শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন। ছেলেকে কখনো কাছছাড়া করতেন না। একদিন বিশেষ কারণবশতঃ মাহবাকে তার বাবা খামার দেখবার জন্য পাঠালেন। পথিমধ্যে তিনি খ্রীষ্টানদের একটি উপাসনালয় থেকে কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে সেখানে ঢুকে দেখলেন তারা নামাজ পড়ছে। এর আগে তিনি কখনো বাইরে আসবার এবং লোকদের দেখবার সুযোগ পাননি। তাদের নামাজ পড়া, বিনম্র ব্যবহার, রীতি-নীতি এবং প্রাণখোলা ব্যবহার তার খুবই ভাল লাগলো। তিনি বাবার আদেশ ভুলে সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করলেন এবং ভাবলেন, তাদের ইবাদতখানায় অন্য মযহাবের লোক প্রবেশ করলে ইবাদতখানা অপবিত্র হয়ে যাবে এবং অগ্নি দেবতার অভিশাপে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে সব মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। এই নীতিই তো মহান ও শ্রেষ্ঠ। যদি কেউ ধর্ম চর্চা করে পরকালের শান্তির আশা করে, তবে এই ধর্মই শান্তির ধর্ম।
তিনি খ্রীস্টানদের ধর্মমত গ্রহণ করতে চাইলে পাদ্রী বললেন, তাকে জেরুজালেম যেতে হবে। কেননা এখানকার রাজ আদেশ মতে কোন অগ্নি উপাসককে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা বেআইনী এবং দণ্ডনীয়। এই আদেশ অমান্যকারীকে এখানে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়ে থাকে। মাহবা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে এলে বাবা বিলম্বের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মিথ্যে বলার অভ্যাস তার ছিল না। তাই তিনি বাবাকে সব খুলে বললেন। বাবা প্রথমে বোঝালেন। পরে পায়ে শিকল দিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখলেন। বাবার এই কঠোর ব্যবস্থায় মাহবার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠল। প্রতীজ্ঞা করলেন যে, সত্য সন্ধানে যদি এমন বাধাই আসে তবে তিনি বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন সব ত্যাগ করবেন।
বন্ধুদের মাধ্যমে মাহবা পাদ্রীর কাছে সংবাদ পাঠালেন যে, সিরিয়ার কোন যাত্রী কাফেলার খোঁজ পেলে তাকে যেন জানানো হয়। পাদ্রী শিকলকাটা যন্ত্র বন্ধুদের মাধ্যমে মাহবার কাছে পাঠিয়ে দিলেন এবং সিরিয়া যাবার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। যেদিন কাফেলা সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হবে সেদিন তিনি পায়ের শিকল কেটে কাফেলার সাথে মিলিত হলেন এবং সিরিয়ায় পৌঁছে গেলেন।
সিরিয়ার প্রধান পাদ্রীর কাছে তাদের ধর্ম গ্রহণ এবং তার খেদমতে থেকে ধর্ম শিক্ষার আগ্রহ জানালেন। সে মাহবাকে তার কাছে রেখে দিল। পাদ্রীটি ছিল জঘন্য প্রকৃতির। লোকদের দান-খয়রাতের ওয়াজ শোনাতো। লোকেরা তার কাছে দান-খয়রাত এনে দিলে সে তা গরীব মিসকীনকে না দিয়ে নিজেই সব আত্মসাৎ করতো। সে সাত মটকী সোনা-রূপা লুকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলে মাহবা উপস্থিত ভক্তদের তার অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং লুকিয়ে রাখা সোনা-রূপা দেখিয়ে দিলেন। এ দুষ্কার্যের জন্য লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তার লাশ শূলি কাঠে ঝুলিয়ে পাথরের আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন করল।
নতুন পাদ্রী নিয়োগ দেয়া হল। তিনি ছিলেন খুব ভাল লোক; দুনিয়ার লিপ্সাহীন এবং আখেরাতের প্রতি আকৃষ্ট। তার সাথে মাহবার সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। তার মৃত্যুর সময় মাহবা জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাকে কি আদেশ করেন এবং তিনি এখন কার আশ্রয়ে থাকবেন। পাদ্রী বললেন, ‘বর্তমানে খাঁটি ধর্ম কোথাও নেই, সকলেই বিকৃত করে ফেলেছে। ইরাকের ‘মোসেল’ এলাকায় একজন খাঁটি খ্রীষ্ট ধর্মীয় পাদ্রী আছেন, তুমি তার কাছে চলে যাও।’
মাহবা বর্ণিত সেই পাদ্রী জিরোমের কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন এবং তার কাছে রয়ে গেলেন। জিরোম একজন সত্যিকার আবেদ এবং জাহেদ ছিলেন। কিন্তু তিনি ইল্‌ম সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন। দামেশকে থাকাকালে মাহবা তাওরাত, ইঞ্জিল প্রভৃতি আসমানী কিতাব পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া ঈসায়ী সাহিত্যে মাহবা বেশ বুৎপত্তি লাভ করেন। কোন সাধারণ রাহেব তার বাছাইয়ের কষ্টিপাথরে টিকে থাকতে পারতো না। একমাত্র এই একটি কারণেই জিরোমের কাছে তার শান্তি মিলছিল না। শুধু ভাবতে লাগলেন কে তাকে বলে দেবে তার মঞ্জিল কোথায়।
একদিন সায়মানা নামে এক ব্যক্তির সাথে তার দেখা হয়। তিনি মানভী শাখার এক পাদ্রী। তিনি মাহবার কাছে তার মযহাব সম্বন্ধে বক্তৃতা করলেন। তিনি আন্তরিকতার সাথে তার মযহাবের আদর্শসমূহ শিক্ষা করতে শুরু করলেন। কেননা তার কাছেই ছিল সত্যের অনুসন্ধান করা। এ সময় জিরোম মারা গেলেন। তার মৃত্যুর আগে মাহবা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার পরে আমি কার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করব?’
তিনি মাহবাকে ইরাকেরই ‘নসীবীন’ এলাকার এক পাদ্রীর খোঁজ দিলেন। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই পাদ্রীর কাছে থাকলেন। তার মৃত্যুকালে মাহবাকে তিনি ‘আমুরিয়া’ নামক স্থানের এক পাদ্রীর খোঁজ দিলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে মাহবা সেই পাদ্রীর কাছে থাকলেন। এখানে তিনি সঞ্চয়ের দ্বারা কিছু পশুপাল সংগ্রহ করেন। পাদ্রীর মৃত্যুর সময় কারো খোঁজ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘বর্তমানে আমার কাছে খাঁটি একটি প্রাণীরও খোঁজ নেই, যার কাছে আশ্রয় নেবার পরামর্শ তোমাকে দেব। অবশ্য এক নতুন নবীর আবির্ভাবকাল ঘনিয়ে আসছে, যিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর খাঁটি একেশ্বরবাদী আদর্শ নিয়ে আসবেন। আরবে জন্মগ্রহণ করবেন এবং উভয় পাশে কাঁকরময় জমি আর মধ্যস্থলে খেজুর বাগানের আধিক্য-এমন এক এলাকায় হিজরত করে সেখানে বসবাস করবেন। সে নবীর নিদর্শন এমন হবে যে, তিনি হাদিয়া বা উপঢৌকনস্বরূপ খাদ্য দিলে তা খাবেন কিন্তু সদকা- খয়রাতের ব‘ খাবেন না এবং তার কাঁধে ‘মোহরে নবুয়ত’ থাকবে। যদি তোমার সাধ্যে কুলায় তবে তুমি সে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।
পাদ্রীর মৃত্যুর পর মাহবা কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। এখানে আরবের একদল বণিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা যদি আমাকে তোমাদের দেশে নিয়ে যাও তবে আমার পশুপাল তোমাদের দিয়ে দেব। এতে তারা রাজি হলো এবং মাহবাকে সঙ্গে নিয়ে আসল। কিন্তু তারা ‘ওয়াদিল ক্কোবা’ নামক স্থানে পৌঁছে অন্যায়ভাবে তাকে ক্রীতদাসরূপে এক ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। এরপর তিনি একজন থেকে অপরজনের কাছে বিক্রি হতে থাকলেন। এমনিভাবে তিনি তের বা ততোধিক মনিবের হাত বদল হন।
শেষে মদীনাবাসী এক ইহুদী মাহবাকে ক্রয় করলে তিনি মদীনায় পৌঁছেন। এলাকা দেখে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এটাই ঐ স্থান যার কথা পাদ্রী বলেছিলেন। তখনো হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মক্কা হতে মদীনায় আসেননি। মাহবা অতি যত্নের সাথে তার প্রতীক্ষায় ব্যাকুল থাকতেন। একদিন সে তার মনিবের উপস্থিতিতে খেজুর গাছের উপরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ এক লোক এসে তার মনিবকে সংবাদ দিল যে, ক্কোবা মহল্লায় মক্কা হতে একজন লোক এসেছে। সে নিজেকে নবী বলে দাবি করে। মাহবা গাছের ওপর থেকে কথাগুলো শুনতে পান। তার শরীর শিউরে ওঠে। উত্তেজনায় গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। কোন প্রকারে গাছ থেকে নেমে মনিবকে সংবাদটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে মাহবাকে ঘুষি মেরে বলল, তুই কাজে থাক। এ সংবাদে তোর দরকার কি? মাহবা বিকালে ক্কোবা মহল্লায় উপস্থিত হয়ে কিছু খাদ্যবস্তু হযরতের সামনে পেশ করলেন। হযরত (সাঃ) সে খাদ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন যে, এগুলো সদকা বা দান। এ কথা শুনে হযরত (সাঃ) তা সঙ্গীদের দিয়ে দিলেন, নিজে খেলেন না। আর একদিন মাহবা কিছু খাবার নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আপনি সদকা-খয়রাত গ্রহণ করেন না দেখে আজ আমি এগুলো আপনার হাদিয়াস্বরূপ পেশ করছি। হযরত (সাঃ) সঙ্গীগণসহ তা খেলেন।
মাহবা ভাবলেন, দু’টা নিদর্শন ঠিক হল। এরপর একদিন হযরত (সাঃ) বসেছিলেন। মাহবা তার পিছনে দাঁড়িয়ে পিঠ মোবারক দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন। নবীজী তার মনোভাব বুঝতে পেরে কাঁধের কাপড় সরিয়ে ফেললেন। মাহবা তার মোহরে নবুয়ত দেখলেন এবং শ্রদ্ধার সাথে চুম্বন করে কেঁদে ফেললেন। হযরত (সাঃ) তার সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহবা তার জীবনের সুদীর্ঘ কাহিনী শোনালেন এবং তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন। মাহবার নাম রাখা হল সালমান। তিনি পারস্যের অধিবাসী বলে সাহাবীরা তাকে ‘সালমান ফারসী’ বলে ডাকেন। যে মহাসত্য সন্ধানে অশেষ দুঃখ, কষ্ট, ঘাত-প্রতিঘাত, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা তিনি সহ্য করেছেন, সত্য সন্ধানী অতৃপ্ত আত্মা শত বৎসরেও যার তৃপ্ত হয়নি সেই অতৃপ্ত আত্মা আজ তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। তখন শুধু হ্নদয় ছাপিয়ে একটি শব্দই সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে প্রভুত্ব করে যাচ্ছিল ‘পেয়েছি।’
ক্রীতদাসরূপে ইহুদীর কাছে আবদ্ধ থাকায় স্বাধীনভাবে হযরতের (সাঃ) সাহচর্য লাভ সম্ভব হচ্ছিল না। এমনকি বদর এবং ওহুদ যুদ্ধে তিনি শরিক হতে পারেননি। তাই হযরত (সাঃ) বললেন, আপনি বিনিময় আদায়ের শর্তে মুক্তি লাভের চুক্তি করে নিন।’ সে মতে তার মনিবের সাথে আলাপ করলে সে তার মুক্তির জন্য দুইটি শর্ত আরোপ করল -(১) তিন বা পাঁচশত খেজুর গাছের চারা সঞ্চয় করে তা রোপণ করতে হবে এবং ঐসব গাছে ফল না আসা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। (২) চল্লিশ ‘উকিয়া’ অর্থাৎ ৬ সেরের অধিক পরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করতে হবে। এই দুই শর্ত পূর্ণ করলে তিনি মুক্তি লাভ করবেন বলে চুক্তি সম্পাদিত হল।
হযরত (সাঃ) সাহাবিগণকে বললেন, খেজুরের চারা দিয়ে তোমরা সবাই সালমানকে সাহায্য কর। সে মতে কেউ পাঁচটা, কেউ দশটা করে খেজুরের চারা তাকে দিলেন। তিন মতান্তরে পাঁচশত খেজুর চারা জমা হলে হযরত (সাঃ) সালমানকে (রাঃ) গাছ রোপণ করার জন্য গর্ত তৈরি করতে বললেন। গর্ত তৈরি হলে হযরত (সাঃ) সেখানে এসে নিজ হাতে গাছগুলো রোপণ করলেন; শুধু একটি গাছ ওমর (রাঃ) রোপণ করলেন। আল্লাহর কুদরতে এক বৎসরেই এই ঐ গাছগুলোতে ফল ধরল। ওমর (রাঃ)-এর লাগানো গাছটিতে এক বৎসরে ফল না ধরায় হযরত (সাঃ) তা উঠিয়ে পুনঃরোপণ করলে ঐ বৎসর তাতে ফল এসে গেল। এভাবে প্রথম শর্ত পূরণ হল।
এদিকে ডিমের আকারে একটি স্বর্ণ চাকা হযরত (সাঃ)-এর হস্তগত হলে তিনি তা সালমানকে (রাঃ) দিয়ে বললেন, ‘এ দিয়ে আপনার মুক্তির শর্ত পূরণ করুন।’ সালমান (রাঃ) এতটুকু স্বর্ণে শর্ত পূরণ হবে না জানালে নবীজী বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা এর দ্বারাই সম্পূর্ণ আদায় করে দেবেন।’
বাস্তবিকই যখন শর্ত আদায়ের জন্য ওজন দেয়া হল তখন তা চল্লিশ উকিয়া পরিমাণ দেখা গেল। এমনিভাবে দুইটি শর্ত পূরণ হল এবং সালমান (রাঃ) আজাদ হয়ে গেলেন। সত্য সাধনার জয়লাভের নিশ্চয়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন সালমান ফারসী (রাঃ)।


**************************
র ও শ ন আ খ তা র
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৯ মে ২০০৮

হযরত আবু যর গিফারী (রা·)...............

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) ছিলেন রাসূল (সাঃ) এর একজন প্রিয় সাহাবী। তার পূর্ব পরিচিত ছিল এরূপঃ বাইরের জগতের সাথে মক্কার সংযুক্তি ঘটিয়েছে যে, আদ্দান উপত্যকাটি, সেখানেই ছিল গিফার গোত্রের বসতি। জুনদুব ইবনে জুনাদাহ আবু যর নামেই যিনি পরিচিত-তিনিও ছিলেন এ কবীলার সন্তান। বাল্যকাল থেকেই তিনি অসীম সাহস, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টির জন্য ছিলেন সকলের থেকে স্বতন্ত্র।
জাহেলী যুগে জীবনের প্রথম ভাগে তার পেশাও ছিল রাহাজানি। গিফার গোত্রের একজন দুঃসাহসী ডাকাত হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যে তার জীবনে ঘটে যায় এক পরিবর্তন। তার গোত্রীয় লোকেরা এক আল্লাহ ছাড়া সকল মূর্তির পূজা করত। তাতে তিনি গভীর ব্যথা অনুভব করতেন। কিছুদিন পরেই তিনি নিজেই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ। ইবনে হাজার ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়, তিনি তার গোত্রের সাথে বসবাস করছিলেন। একদিন সংবাদ পেলেন মক্কায় এক নতুন নবীর আবির্ভাব হয়েছে; তাই তিনি তার ভাই আনিসকে ডেকে বললেনঃ তুমি একটু মক্কায় যাবে। সেখানে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন এবং আসমান থেকে তার কাছে ওহী আসে বলে প্রচার করে থাকেন; তার সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করবে, তার মুখের কিছু কথা শুনবে। তারপর ফিরে এসে আমাকে অবহিত করবে। আনিস মক্কায় চলে গেলেন। রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখ নিঃসৃত বাণী শ্রবণ করে নিজ গোত্রে ফিরে এলেন। আবু যর (রাঃ) খবর পেয়ে তখনই ছুটে গেলেন আনিসের কাছে। অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে নতুন নবী সম্পর্কে নানান কথা তাকে জিজ্ঞেস করলেন। আনিস বললেনঃ কসম আল্লাহর। আমি তো লোকটি দেখলাম, মানুষকে তিনি মহৎ চরিত্রের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। আর এমন কথা বলেন যা কাব্য বলেও মনে হল না। মানুষ তার সম্পর্কে কি বলাবলি করে? কেউ বলে- তিনি একজন যাদুকর, কেউ বলে গণক, আবার কেউ বলে কবি। আল্লাহর কসম। তুমি আমার তৃষ্ণা মেটাতে পারলে না। আমার আকাঙক্ষাও পূরণ করতে সক্ষম হলে না। তুমি কি পারবে আমার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে, যাতে আমি মক্কায় গিয়ে স্বচক্ষেই তার অবস্থা দেখে আসতে পারি? তবে আপনি মক্কাবাসীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।
পরদিন সকালে আবুযর চললেন মক্কার উদ্দেশ্যে। সাথে নিলেন কিছু পাথেয় ও এক মশক পানি। সর্বদা তিনি শংকিত, ভীত চকিত। কোন ব্যক্তির কাছে মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে কোন কথা জিজ্ঞেস করা তিনি সমীচীন মনে করলেন না। কারণ, তার জানা নেই এ জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিটি মুহাম্মদের বন্ধু না শত্রম্ন? দিনটি কেটে গেল। রাতের আঁধার নেমে এল। তিনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। বিশ্রামের উদ্দেশ্যে তিনি শুয়ে পড়লেন মাসজিদুল হারামের এক কোণে। আলী ইবন আবী তালিব যাচ্ছিলেন সে পথ দিয়েই। দেখে তিনি বুঝতে পারলেন লোকটি মুসাফির। ডাকলেন, আসুন আমার বাড়িতে। আবুযর গেলেন তার সাথে এবং সেখানেই রাতটি কাটিয়ে দিলেন।
সকালবেলা পানির মশক ও খাবারের পুঁটলিটি হাতে নিয়ে আবার ফিরে এলেন মাসজিদে। তবে দু’জনের একজন ও একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। পরের দিনটিও কেটে গেল। কিন্তু নবীর সাথে পরিচয় হল না। আজো মাসজিদে শুয়ে পড়লেন। আজো আলী (রাঃ) আবার সে পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। বললেনঃ ব্যাপার কি, লোকটি আজো তার গন্তব্যস্থল চিনতে পারেনি? তিনি তাকেই আবার সাথে করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এ রাতটি সেখানে কেটে গেল। এদিনও কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। একইভাবে তৃতীয় রাতটি নেমে এল। আলী (রাঃ) আজ বললেন- বলুন তো আপনি কি উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন? তিনি বললেন, যদি আমার কাছে অঙ্গীকার করেন, আমার কাঙিক্ষত বিষয়ের দিকে আপনি আমাকে পথ দেখাবেন, তাহলে আমি বলতে পারি। আলী (রাঃ) অঙ্গীকার করলেন। আবু যর বললেনঃ আমি অনেক দূর থেকেই মক্কায় এসেছি নতুন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তিনি যেসব কথা বলেন, তার কিছু শুনতে। আলীর (রাঃ) মুখ-মণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, আল্লাহর কসম, তিনি নিশ্চিত সত্য নবী। একথা বলে তিনি নানাভাবে নবীর (সাঃ) পরিচয় দিলেন। তিনি আরো বললেন, সকালে আমি যেখানেই যাই, আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি আপনার জন্য আশংকাজনক কোনকিছু লক্ষ্য করি তাহলে প্রস্রাবের ভান করে দাঁড়িয়ে যাব। আবার যখন চলব, আমাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবেন। এভাবে আমি যেখানে প্রবেশ করি আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। প্রিয়নবী দর্শন লাভ ও তার ওপর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ শ্রবণ করার প্রবল আগ্রহ ও উৎকণ্ঠায় আবু যর সারাটা রাত বিছানায় স্থির হতে পারলেন না। পরদিন সকালে মেহমান সাথে করে আলী (রাঃ) চললেন রাসূল (সাঃ)-এর বাড়ির দিকে। আবু যর তার পেছনে পেছনে। পথের আশপাশের কোনকিছুর প্রতি তার ভ্রম্নক্ষেপ নেই। এভাবে তারা পৌঁছলেন রাসূল (সাঃ)-এর কাছে। আবু যর সালাম করলেন। আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন, ওয়া আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ। এভাবে আবু যর সর্বপ্রথম ইসলামী কায়দায় রাসূল (সাঃ)-কে সালাম পেশ করার গৌরব অর্জন করেন। অতঃপর সালাম বিনিময়ের এ পদ্ধতিই গৃহীত ও প্রচারিত হয়।
রাসূল (সাঃ) আবু যরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শোনালেন। সেখানে বসেই আবু যর কালেমায়ে তাওহীদের পাঠ করে নতুন দ্বীনের মধ্যে প্রবেশের ঘোষণা দিলেন এবং তার সাথে সাথেই তাওহীদের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য ওঠে-পড়ে লেগে গেলেন। আবু যর (রাঃ) বলেন-আমি মসজিদে এলাম। কুরাইশরা তখন একত্রে বসে গুজব করছে। আমি তাদের মাঝে হাযির হয়ে যতদূর সম্ভব উচ্চকণ্ঠে সম্বোধন করে বললাম, কুরাইশ গোত্রের লোকেরা আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল। এ কথা বলার সাথে সাথেই কুরাইশরা ভীত-চকিত হয়ে পড়ল এবং একযোগে সবাই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আমাকে বেদম প্রহার শুরু করল। রাসূলের চাচা- আব্বাস আমাকে চিনতে পেরে তাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করলেন। একটু সুস্থ হয়ে আমি রাসূল (সাঃ)-এর কাছে ফিরে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে তিনি বললেন, তোমাকে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলাম না? বললাম ইয়া রাসূলুল্লাহ! নিজের মধ্যে এক প্রবল ইচ্ছা অনুভব করছিলাম। সে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছি মাত্র।
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালীন আল-ইসাবা গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন লোকেরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে গমনের ব্যাপারে ইতস্ততঃ প্রকাশ করতে লাগল। কোন ব্যক্তিকে দেখা না গেলে সাহাবীরা বলতেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ অমুক আসেনি। জবাবে তিনি বলতেন, যদি তার উদ্দেশ্য মহৎ হয়, তাহলে শিগগিরই আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে মিলিত করবেন। এক সময় আবুযরের নামটি উল্লেখ করে বলা হল, সেও পিঠটান দিয়েছে।
প্রকৃত ঘটনা হল, তার উটের ছিল মন্থর গতি। প্রথমে তিনি উটটিকে দ্রুত চালাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে নিজের কাঁধে উঠিয়ে হাঁটা শুরু করেন এবং অগ্রবর্তী মানজিলে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এক সাহাবী দূর থেকে তাকে দেখে বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ রাস্তা দিয়ে কে একজন যেন আসছে। তিনি বললেনঃ আবু যরই হবে। লোকেরা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে চিনতে পারল এবং বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, এতো আবু যরই। তিনি বললেন, আল্লাহ আবু যরের ওপর রহমত করুন। সে একাকী চলে, একাকীই মরবে, কিয়ামতের দিন একাই উঠবে। (তারীখুল ইসলামঃ আল্লামা যাহাবী ৩য় খণ্ড)।
রাসূল (সাঃ)-এর দ্বিতীয় ভবিষ্যৎ বাণীটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। হযরত আবু যর ছিলেন প্রকৃতিগতভাবেই সরল, সাদাসিধে, দুনিয়াবিরাগী ও নির্জনতা প্রিয় স্বভাবের। এ কারণে রাসূল (সাঃ) তাঁর উপাধি দিয়েছিলেন- ‘মসিরুল ইসলাম।’ রাসূল (সাঃ)-এর ওফাতের পর তিনি দুনিয়ার সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন হয়ে পড়েন। প্রিয় নবীর বিচ্ছেদে তাঁর অন্তর অভ্যন্তরে যে দাহ শুরু হয়েছিল তা আর কখনো প্রশমিত হয়নি।
হযরত আবু যর (রাঃ) এর ওফাতের কাহিনীটিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। হিজরী ৩১ মতান্তরে ৩২ সনে তিনি রাবজার মরুভূমিতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর সহধর্মিনী তাঁর অন্তিমকালীন অবস্থার বর্ণনা করেছেন এভাবে- আবু যরের অবস্থা যখন খুবই খারাপ হয়ে পড়ল, আমি তখন কাঁদতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, কাঁদছ কেন? বললামঃ এক নির্জন মরুভূমিতে আপনি পরকালের দিকে যাত্রা করছেন। এখানে আমার ও আপনার ব্যবহ্নত বস্ত্র ছাড়া অতিরিক্ত এমন বস্ত্র নেই যা দ্বারা আপনার কাফন দেয়া যেতে পারে। তিনি বললেনঃ কান্না থামাও। তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে একজন মরুভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তার মরণের সময় মুসলিমদের একটি দল সেখানে অকস্মাৎ উপস্থিত হবে। আমি ছাড়া সে লোকগুলোর সকলেই লোকালয়ে ইন্তেকাল করেছে। এখন মাত্র আমিই বেঁচে আছি। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সে ব্যক্তি আমিই।
সেই কাফেলাটি হল ইয়ামেনী। তারা কুফা থেকে এসেছিল। আর তাদের সাথে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)। এ কাফিলার সাথে তিনি ইরাক যাচ্ছিলেন। তিনিই আবু যরের জানাযার ইমামতি করেন এবং সকলে মিলে তাকে রাবজার মরুভূমিতে দাফন করেন।

**************************
মা ও লা না শা হ মো হা ম্ম দ হা বি বু র র হ মা ন
দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ জুলাই, ২০০৮